নিজস্ব প্রতিনিধি : যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক বিতর্ক এবার আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়াইনে মুলিন প্রকাশ্যে নিউইয়র্কবাসীর উদ্দেশে “বোধোদয়” হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যতে মেয়র মামদানিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত প্রদান করেছেন।
গত ১১ জুন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং “স্যাঙ্কচুয়ারি সিটি” নীতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মুলিন মেয়র মামদানির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি সিটির প্রথম মুসলিম ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত এই মেয়রকে “র্যান্টডিক্যাল সোশ্যালিস্ট” ও “পুলিশবিরোধী” হিসেবে আখ্যা দেন। পাশাপাশি তিনি মামদানিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে সরাসরি বাধা সৃষ্টিিকারী নেতা হিসেবেও উল্লেখ করেন।
মুলিন তাঁর বক্তব্যে বলেন, নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগ (এনওয়াইপিডি) দেশের অন্যতম দক্ষ ও পেশাদার বাহিনী হলেও তারা বর্তমানে এমন একজন নেতা পেয়েছে, যিনি তাদের কাজের পরিধি প্রতিনিয়ত সীমিত করে দিচ্ছেন। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারির ভাষায়, “এনওয়াইপিডির সদস্যরা তাদের কাজ করতে চান, কিন্তু তাদের এমন একজন নেতা রয়েছে যিনি তাদের হাত-পা বেঁধে রেখেছেন।”
এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, নিউইয়র্কবাসী আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সিটির জন্য একজন “প্রকৃত নেতৃত্ব” বেছে নেবে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মুলিনের এই মন্তব্যকে কেবল সাধারণ প্রশাসনিক সমালোচনা হিসেবে দেখছেন না, বরং এটিকে সিটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণের একটি বড় ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করছেন।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মেয়র মামদানির মধ্যে অতীতে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে দুই পক্ষের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তীব্র রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প ওভাল অফিসে মামদানিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং সহযোগিতার সুযোগ দিয়েছিলেন, তবে বৈঠকের পর মামদানির অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে চলে যায়।
অন্যদিকে মেয়র মামদানি প্রথম থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির একনিষ্ঠ ও কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। ওভাল অফিসের ওই বৈঠকের পর দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ট্রাম্পকে সরাসরি “ফ্যাসিস্ট” বলে উল্লেখ করেছিলেন। তবে একই সঙ্গে নিউইয়র্কের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোসহ নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ থাকার কথাও তিনি স্বীকার করেন।
বিশেষ করে অভিবাসন নীতি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। মেয়র মামদানি দীর্ঘদিন ধরে ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস)-এর বিভিন্ন কার্যক্রমের তীব্র সমালোচনা করে আসছেন এবং সংস্থাটির ক্ষমতা সীমিত করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে আইস-এর ক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়ানোর পক্ষে অনড়।
এর আগেও সেক্রেটারি মুলিন অভিযোগ তুলেছিলেন যে, মেয়র মামদানির প্রগতিশীল অভিবাসন নীতি নিউইয়র্কের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরমভাবে দুর্বল করছে। এর ফলে সিটির সাধারণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে মামদানির সমর্থকরা এই সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছেন, তিনি মূলত অভিবাসী সম্প্রদায়, শ্রমজীবী মানুষ এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মৌলিক স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন। তাদের মতে, ফেডারেল সরকারের সঙ্গে তাঁর এই বিরোধ মূলত অভিবাসন নীতি, নাগরিক অধিকার এবং স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে আদর্শিক মতপার্থক্যেরই প্রতিফলন।
নিউইয়র্কের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই বাক্যবিনিময় কেবল কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় দ্বন্দ্ব নয়, বরং ফেডারেল সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং নিউইয়র্ক সিটির প্রগতিশীল প্রশাসনের মধ্যে তৈরি হওয়া বৃহত্তর আদর্শিক সংঘাতের প্রকাশ।
আগামী দিনে অভিবাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং ফেডারেল-স্থানীয় সরকারের ক্ষমতার প্রশ্নে এই দ্বিপাক্ষিক বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতীক হিসেবে পরিচিত মেয়র জোহরান মামদানি বর্তমানে একদিকে যেমন তাঁর অনুসারীদের সমর্থন পাচ্ছেন, তেমনই রক্ষণশীল মহলের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন।
