লেখক: সৈয়দা রাজিয়া মোস্তফা বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা
বগুড়ার ২ উপজেলায় (শিবগঞ্জ ও মোকামতলা) নতুন করে ৩টি ইউনিয়ন পরিষদ গঠন করা হয়েছে। এই অনুমোদিত গেজেটেই ঘটে গেছে এক নজিরবিহীন ‘তুঘলকি কাণ্ড’। নতুন ইউনিয়নের নাম মীরবাড়ি, সীমান্ত, দিগন্ত। যা এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি দলীয় স্থানীয় সাংসদ মীর শাহে আলমের বংশ ও ২ সন্তানের নাম। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার বিভাগ নতুন এই ইউনিয়ন পরিষদের গেজেট প্রকাশ করে। এখন ব্যাখা যাই দেওয়া হোক- এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ২ ছেলে দিগন্ত ও সীমান্ত এবং তাদের বংশীয় উপাধি ‘মীর’–এর নামানুসারেই যে এই ৩টি নতুন ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ করা হয়েছে- তা নিশ্চিত। গেজেট প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।
সংসদে ও সংসদের বাইরে ব্যাপক সমালোচনায় মুখে সংসদে ২৭৪ বিধিতে সংসদে একটি হাস্যকর ব্যাখ্যা দেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, আমার নির্বাচনি এলাকা মোকামতলার দূরবর্তী দুইটি ইউনিয়ন সৈয়দপুর ও দেউলী ইউনিয়ন। এই দুইটি ইউনিয়ন অনেক বড় ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং জেলা প্রশাসক যাচাই বাছাই করে গণশুনানি করে সৈয়দপুর ইউনিয়নটি যেহেতু গাবতলী ও সোনাতলা সীমান্তে, সেই কারণে সৈয়দপুরের সাথে নাম মিল করে সীমান্তবর্তী হওয়ায় নতুন ইউনিয়নের নাম করেছে সীমান্ত ইউনিয়ন। আরেকটি ইউনিয়নের নাম ছিল দেউলী ইউনিয়ন। যেটি গাইবান্ধার একদম কাছে, অনেক দূরে হওয়ায় যে কারণে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের শুনানিতে সেই ইউনিয়নের নাম রাখা হয়েছে দিগন্ত ইউনিয়ন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ৩ ইউনিয়নের নাম মিরাক্যালি আমার দুই সন্তানের নামের সঙ্গে মিলে গেছে। অবশ্য বংশ পরিচয়ের ‘মীরবাড়ি’ ইউনিয়ন নামকরণের ব্যাপারে তিনি কোন ব্যাখা দেননি। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনিক ইউনিটের নাম নির্ধারণে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পরিবর্তে এখানে পারিবারিক প্রভাব খাটানো হয়েছে। অনেকেই বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বগুড়ার নতুন জমিদার। ইউনিয়ন পরিষদের নাম পরিবর্তন করে বংশীয় ও সন্তানদের নামে নামকরণ করছেন। আহ! ক্ষমতা!’ প্রতিমন্ত্রীর এমন ক্ষমতার অপব্যবহার ও ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করছেন নেটিজেনরা।
আসলে স্থানীয় সরকার জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রশাসনিক কাঠামো। ইউনিয়ন, উপজেলা কিংবা পৌরসভার নাম কেবল একটি প্রশাসনিক পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং মানুষের আবেগ। সেই কারণে কোনো এলাকার নামকরণ বা পুন:নামকরণ একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এটি কখনোই কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হতে পারে না। যদি সত্যিই স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকার তিনটি ইউনিয়নের নাম নিজের বাড়ি ও দুই পুত্রের নামে নামকরণের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন, তাহলে তা নিঃসন্দেহে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এক ধরনের হীন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা জনগণের দেওয়া একটি অর্পিত দায়িত্ব। এই দায়িত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা এবং জনগণের সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করা। কিন্তু যখন কোনো জনপ্রতিনিধি রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক ক্ষমতাকে নিজের বা পরিবারের ব্যক্তিগত মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করেন, তখন তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। কারণ রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের সম্পত্তি নয়।
বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, স্বৈরাচারী শাসক কিংবা ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতিতে আক্রান্ত সমাজে রাস্তা, ভবন, প্রতিষ্ঠান কিংবা জনপদের নাম নিজেদের বা পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণের প্রবণতা দেখা যায়। এর মাধ্যমে এক ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। গণতন্ত্রে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান বড়; পরিবার নয়, জনগণই সর্বোচ্চ। তাই একজন দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন মানসিকতা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।
একটি ইউনিয়নের নাম শুধু একটি প্রশাসনিক পরিচিতি নয়; এটি একটি এলাকার শত বছরের ইতিহাস, ভূগোল, ঐতিহ্য ও জনগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে। কোনো নাম পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মতামত, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং প্রশাসনিক যৌক্তিকতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। কিন্তু যদি শুধুমাত্র একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির ইচ্ছার কারণে বা তার পারিবারিক আবেগের কারণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তা জনগণের মতামত ও ইতিহাসকে অবজ্ঞা করার শামিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে। আজ যদি একজন মন্ত্রী তার বাড়ি বা সন্তানের নামে ইউনিয়নের নামকরণ করেন, তাহলে আগামী দিনে অন্যরাও একই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত হবেন। ফলে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যক্তিগত স্মারক নির্মাণের প্রতিযোগিতায় পরিণত হবে। এতে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তিপূজা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক ও আধুনিক রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যেতে হলে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের মনে রাখতে হবে, তাদের ক্ষমতা সাময়িক, কিন্তু জনগণ ও ইতিহাস স্থায়ী। ইতিহাসে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জিত হয় কাজের মাধ্যমে, নামফলক বা স্মারক নির্মাণের মাধ্যমে নয়।
আমি মনে করি, মীর শাহে আলম উচিত হবে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা এবং জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব রয়েছে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার কখনোই ব্যক্তিগত গৌরব প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হতে পারে না।
মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ তাদের মনে রাখে উন্নয়ন, সততা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য; নিজের নাম বা পরিবারের নাম প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। একজন রাজনীতিবিদের প্রকৃত স্মারক তার কর্ম, তার সততা এবং জনগণের হৃদয়ে অর্জিত স্থান। ইউনিয়নের নাম নিজের বাড়ি বা সন্তানদের নামে নামকরণ করার মধ্য দিয়ে সাময়িক আত্মতৃপ্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু তা ইতিহাসে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে না। তাই, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনপদের পরিচয়কে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করার যে কোনো প্রচেষ্টা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। জনস্বার্থের প্রতিষ্ঠান ও জনপদের নাম জনগণের ঐতিহ্য ও সম্মিলিত পরিচয়ের প্রতীক। এগুলো কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের আত্মপ্রচারের মাধ্যম হতে পারে না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই যে, ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং জনগণের ইতিহাস ও পরিচয় কোনো ব্যক্তির খেয়ালখুশির কাছে জিম্মি হতে পারে না।
