নিজস্ব প্রতিনিধি : কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে পুলিশের এক সদস্যের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া এক লাখ পিস ইয়াবা বড়ি গায়েব করে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এই ঘটনায় কোনো মামলা না করে ইয়াবাগুলো আত্মসাৎ করা হয় এবং তৎকালীন ওসির নির্দেশে মাদক বহনকারী পুলিশ সদস্যকে ছেড়ে দেওয়া হয়। চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ দুর্নীতি ও মাদক লোপাটের চিত্র উঠে এসেছে।
জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠানো হলেও রহস্যজনকভাবে অভিযুক্ত ওসির বিরুদ্ধে এখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঘটনার প্রায় ছয় মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়নি, উদ্ধার করা যায়নি আত্মসাৎ হওয়া ইয়াবাও। এমনকি ইয়াবা পাচারে অভিযুক্ত সেই মূল পুলিশ সদস্যকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি ঘটে গত বছরের ৮ ডিসেম্বর। কক্সবাজার জেলা আদালতের এক বিচারকের গানম্যান কনস্টেবল ইমতিয়াজ হোসেন ১ লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে দেশ ট্রাভেলসের একটি বাসে করে চট্টগ্রাম আসছিলেন। বাসটি শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার পুলিশ সদস্যরা তাকে আটক করে পুলিশ বক্সে নিয়ে যায়। সেখানে লাগেজের ভেতরে ১০টি প্যাকেটে থাকা ১ লাখ ইয়াবা নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা তা নিজেদের দখলে নেয়। পরে কাপড়চোপড়সহ খালি লাগেজটি ইমতিয়াজকে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার সময় বাকলিয়া থানার ওসির দায়িত্বে ছিলেন আফতাব উদ্দিন, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানার ওসির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদসহ ৯ পুলিশ সদস্য ও অভিযুক্ত গানম্যান ইমতিয়াজকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন সাবেক ওসি আফতাব উদ্দিন।
বরখাস্ত হওয়া বাকি পুলিশ সদস্যরা হলেন— এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান ও কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।
তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের সরাসরি নির্দেশেই ইয়াবা বড়িগুলো রেখে বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ওসি শুধু আইন লঙ্ঘনই করেননি, বরং ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও গায়েব করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে আফতাব উদ্দিন দাবি করেছেন, “ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।”
পুলিশের তদন্ত কমিটির প্রধান ও সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরী জানান, ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশসহ প্রতিবেদন পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে সদ্য যোগ দেওয়া নগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’ এবং এতদিন কেন এই ঘটনায় নিয়মিত মামলা করা হয়নি তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
