নিজস্ব প্রতিনিধি : চব্বিশের জুলাইয়ের ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন তীব্র সংকটের মুখে পড়েছিল, তখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং একটি স্থিতিশীল নির্বাচনমুখী পরিবেশ তৈরি করাই ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার বিলম্বে হলেও এটি উপলব্ধি করে যে স্বাভাবিক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একমাত্র টেকসই পথ হলো নির্বাচন, যার কোনো বিকল্প নেই।
তবে অন্তর্বর্তী প্রশাসনকে এটিও মনে রাখতে হবে যে তাদের মূল নৈতিক ভিত্তি ছিল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য, দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কোনো বৈধতা তাদের নেই। কিন্তু এই অস্থায়ী সরকার যখনই স্থায়ী বা নির্বাচিত সরকারের মতো দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের পথে হাঁটতে শুরু করল, তখন থেকেই তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে গভীর স্ববিরোধিতা ও প্রশ্ন দেখা দিতে শুরু করল।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. ইউনূস বিশ্বমঞ্চে দারিদ্র্যশূন্য, বেকারত্বশূন্য এবং কার্বন নিঃসরণশূন্য ‘থ্রি জিরো’ বা তিন শূন্যের পৃথিবীর স্বপ্ন দেখালেও বাংলাদেশে তাঁর শাসনকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনটি মারাত্মক শূন্যের জন্ম হয়েছে। এই নতুন তিন শূন্য হলো—শূন্য জবাবদিহি, শূন্য জনআস্থা এবং শূন্য গণতান্ত্রিক সহনশীলতা, যা দেশের ইতিহাসকে এক অন্ধকার অধ্যায়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
সরকারের মূল কাজ যেখানে ছিল সুনির্দিষ্ট মেয়াদে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা, সেখানে তারা তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা থেকে সরে এসে স্থায়ী সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে শুরু করে। সাংবিধানিক কমিশন গঠন, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্কারের নামে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ এড়িয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষের মনে চরম অনিশ্চয়তা ঘনীভূত হতে থাকে।
এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্রমেই অধৈর্য হয়ে পড়েছে, জনআস্থা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা থমকে দাঁড়িয়েছে। সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ছাড়া সরকারের প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষ এখন ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার কৌশল হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সরকারের আমলে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংবাদপত্রের কার্যালয়ে ভাঙচুর ও গণমাধ্যম সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে অনবরত ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশে এক ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করা হয়েছে, যা স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার ও নাগরিক সংস্কৃতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।
একই সাথে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে নীতিগত বৈরিতায় রূপ দিয়ে ঢালাওভাবে প্রতিপক্ষকে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়ে ঘায়েল করার এক নোংরা রেওয়াজ দেশজুড়ে চালু হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সহনাগরিক না ভেবে চরম শত্রু হিসেবে গণ্য করার এই প্রবণতা দেশের বহুত্ববাদ ও ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক পরিবেশের ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করেছে।
অনির্বাচিত একটি সরকার যতই দক্ষ বা সদিচ্ছাপ্রণোদিত হোক না কেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোট ও জনসম্মতি ছাড়া তাদের কোনো স্থায়ী সংস্কার করার নৈতিক অধিকার থাকে না। ড. ইউনূসের সরকার গণতন্ত্রের এই মৌলিক সত্যটি উপলব্ধি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে আজ দেশের সব ইতিবাচক সূচকই শূন্যের কোঠায় গিয়ে ঠেকেছে।
