নিজস্ব প্রতিনিধি: আমির খানের কালজয়ী সিনেমা ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর কথা সবারই মনে আছে, যেখানে তিন মেধাবী শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নির্দোষ দুষ্টুমির মাধ্যমে শিক্ষার আসল লক্ষ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে সদ্য বিদায়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ‘থ্রি ইডিয়টস’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তিন উপদেষ্টার কর্মকাণ্ড ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর ও বিপর্যয়কর। সিনেমার ইডিয়টদের শাসন করতেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান; কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের এই তিন ইডিয়টকে নিজের স্বার্থে পরম যত্নে লালন-পালন ও আশকারা দিতেন স্বয়ং সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিগত দেড় বছরে ইউনূস সরকারের আমলে যত বড় বড় অপকর্ম, লুণ্ঠন, বিচার বিভাগ ধ্বংস এবং নির্বাচন বানচালের চক্রান্ত হয়েছে—তার সবকিছুর সুতা নড়েছে এই তিন উপদেষ্টার ইশারায়। ড. ইউনূসের মূল লক্ষ্য ছিল নিজের ব্যক্তিগত ও আইনি স্বার্থ উদ্ধার। তিনি দেড় বছরে নিজের সব মামলা প্রত্যাহার, কর মওকুফ থেকে শুরু করে গ্রামীণ ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স হাতিয়ে নিয়েছেন। আর তাঁর এই অবাধ স্বজনপ্রীতি ও লুটপাটকে আড়াল করতে দেশে এক বিশৃঙ্খল মব পরিবেশের দরকার ছিল, যা তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন এই তিন উপদেষ্টা। এরা হলেন—সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, সাবেক শিল্প ও গৃহায়ণ উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। কাকতালীয়ভাবে, এই তিনজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
আসিফ নজরুলের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার স্বপ্ন ও বিচার বিভাগ ধ্বংসের কলঙ্ক
উপদেষ্টা পরিষদে আদিলুর রহমান বয়সে সিনিয়র হলেও পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের মূল চালিকাশক্তি ও ডন ছিলেন আসিফ নজরুল। চব্বিশের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর সেনাসদরের বৈঠকে আসিফ নজরুল নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ছাত্রনেতারা ড. ইউনূসের নামে অনড় থাকায় তাঁর সেই স্বপ্নভঙ্গ হয়। এরপর তিনি ধুরন্ধর কায়দায় ড. ইউনূসের সাথে আপস করেন এবং ছাত্রদের নিজের ‘হাতের মুঠোয়’ দাবি করে উপদেষ্টামণ্ডলীতে নিজের পছন্দের লোক হিসেবে আদিলুর ও রিজওয়ানা হাসানকে অন্তর্ভুক্ত করান।
আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়েই আসিফ নজরুল ড. ইউনূসের সব মামলা প্রত্যাহারে বিচার বিভাগে নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ শুরু করেন। উচ্চ আদালতের একাধিক বিচারপতিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শিক্ষার্থীদের দিয়ে ‘মব জাস্টিস’ করিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সব বিচারপতিকে একযোগে পদত্যাগে বাধ্য করেন, যা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। এরপর নিজের একক কর্তৃত্বে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে দলীয় ও পকেট বিচারক এবং সরকারি আইনজীবী (পিপি/জিপি) নিয়োগের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।
কেবল বিচার বিভাগই নয়, জোর করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে লাইসেন্স বাণিজ্যের এক নতুন ভাণ্ডার খোলেন আসিফ নজরুল। কোনো প্রয়োজন ছাড়াই নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রদানের নামে তিনি অন্তত ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত করেছেন। একেকটি লাইসেন্সের জন্য ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে তোলার কারণে পরবর্তীতে ছাত্র উপদেষ্টাদের সাথেও তাঁর তীব্র বিরোধ তৈরি হয়।
পরিবেশ রক্ষার আড়ালে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের শত কোটির টেন্ডার ও তদবির বাণিজ্য
আসিফ নজরুলের সমান্তরালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছিলেন সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন উন্নয়ন ও গবেষণা প্রকল্পের নামে কোনো কাজ না করেই শত কোটি টাকা লোপাট করেছেন তিনি। সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বিপুল অবৈধ সম্পত্তি ক্রোকের তালিকা থেকে রিজওয়ানার বিশেষ তদবিরে গুলশান ক্লাবের বিপরীতের প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের এক বিঘা জমির একটি প্লট বাদ দেওয়া হয়, যার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়েছে।
এছাড়া দেশজুড়ে পলিথিন নিষিদ্ধের নাটক করে পলিথিন উৎপাদকদের সাথে গোপন সমঝোতা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর সেই অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটনকেন্দ্র থেকে অবৈধ পাথর উত্তোলন সিন্ডিকেটের সাথেও তাঁর মন্ত্রণালয়ের যোগসাজশ ছিল। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া, বন অধিদপ্তরের লাভজনক পদে বদলি এবং ইটভাটার লাইসেন্স নবায়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে উপদেষ্টার স্বামীর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সামনে এসেছে।
গুপ্ত অপরাধের কারিগর ও নির্বাচন বানচালের মূল ষড়যন্ত্রকারী আদিলুর রহমান
অন্যদিকে, আরেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ছিলেন একজন চরম ধুরন্ধর ও গুপ্ত দুর্নীতিবাজ। সাবেক জাসদ কর্মী হওয়ায় পর্দার আড়ালে থেকে ষড়যন্ত্র করাই ছিল তাঁর মূল অস্ত্র। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচন বানচালের মূল মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই আদিলুর। অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুখ্যাত ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাচন ভণ্ডুল করতে সারা দেশে কৃত্রিম মব ও নৈরাজ্য সৃষ্টির মূল কারিগর ছিলেন তিনি। ওই সময় মবদের দিয়ে দুটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র অফিসে হামলা চালানো হয় এবং পুলিশ যাতে সময়মতো পৌঁছাতে না পারে, সেই নির্দেশও দিয়েছিলেন আদিলুর। এই ঘটনার প্রতিবাদে প্রধান উপদেষ্টার একজন বিশেষ সহকারী পদত্যাগ করে ড. ইউনূসের কাছে নালিশ করলেও ইউনূস কোনো ব্যবস্থা নেননি; কারণ ড. ইউনূস নিজেও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন।
দেড় বছরের শাসনে দেশের অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে ইউনূস সরকারের এই ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিন্ডিকেট। এই সব গুরুতর অভিযোগ ও হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক এই তিন উপদেষ্টার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি, এমনকি লিখিত বার্তারও কোনো জবাব দেননি।
