নিজস্ব প্রতিনিধি: সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে ও নাজুক, বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় না থাকলেও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষিত ‘লাল টেলিফোনের’ (Red Telephone) তার চুরির ঘটনায় তা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। শুধু সীমানাপ্রাচীর উঁচু করা কিংবা কাঁটাতারের বেড়া দিলেই যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দপ্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, এই নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
সচিবালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনাটি কোনো সাধারণ চুরি নয়; এটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আমলে নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা সচিবদের সুরক্ষায় কেবল প্রবেশদ্বারে কড়াকড়ি করলেই চলবে না, সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মরত জনবলকেও কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। জানা গেছে, ঈদুল আজহার ছুটির মধ্যে সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় এ পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুরো সচিবালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট সব মহলে তীব্র সংশয় ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে তদন্তে মাঠে নেমেছে একাধিক উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থা।
সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন—যেখানে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সশস্ত্র পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি হয়ে যায়, সেখানে অন্যান্য সাধারণ মন্ত্রণালয় ও সাধারণ মানুষের নথিপত্রের নিরাপত্তা কোথায়?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী যে দপ্তরে নিয়মিত অফিস করেন, যে দপ্তরে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান, সেই পরম সুরক্ষিত জোন থেকে তামার তার চুরি হতে পারলে সেখানে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এর আগে কখনো এ ধরনের জঘন্য ও স্পর্শকাতর ঘটনা ঘটেছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. হেলাল উদ্দিন জানান, সচিবালয়ে বাইরের সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নেই। সরকারের কার্ডধারী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিশেষ পাসধারী দর্শনার্থী ছাড়া কেউ এখানে ঢুকতে পারে না। তার ওপর রয়েছে শখানেক সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরা। এত সুরক্ষার মাঝে এই ঘটনা কীভাবে ঘটল, সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো আদৌ সচল আছে কি না, কিংবা ফুটেজ কেউ নিয়মিত মনিটর করে কি না—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
জানা গেছে, সচিবালয়ের ভবনগুলোর চাবি সংরক্ষণের দায়িত্ব গণপূর্ত বিভাগের। অফিস ছুটির পর নির্দিষ্ট কর্মচারীরা সব ভবনের প্রবেশপথ তালাবদ্ধ করেন। সেই তালা খুলে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কীভাবে ছাদে গিয়ে তার কেটে সচিবালয় থেকে অনায়াসে বেরিয়ে গেল, তা কারও চোখে না পড়া চরম রহস্যজনক। এই ঘটনায় গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীসহ দায়িত্বরত নিরাপত্তা রক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হতে পারে।
সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কর্মরত পুলিশ সদস্য রেজাউল করিম জানিয়েছেন, এই ঘটনার পর ভেতরের বিভিন্ন দোকান-রেস্তোরাঁর মালিক ও শ্রমিকদের ওপর কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন নামসর্বস্ব সংগঠনের কর্মকাণ্ডও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে, কারণ অনেক সময় এই সংগঠনের নেতারা বাইরের কর্মচারীদের দলবদ্ধভাবে সচিবালয়ে নিয়ে আসেন, যা নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
আউটসোর্সিংয়ের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের মনিটরিংয়ের অভাবকে এই চুরির প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন একজন উপসচিব। তিনি বলেন, “সকাল ৯টার আগে একদল পরিচ্ছন্নতাকর্মী সচিবালয়ে প্রবেশ করেন। তারা কারা, কতজন ঢোকার কথা, তাদের আইডি কার্ড ও তল্লাশি করা হচ্ছে কি না, তা দেখার কেউ নেই। টাইম শিডিউল ও মনিটরিং থাকলে এমন ঘটনা ঘটত না।”
সিটিটিসি-র অভিযানে গ্রেপ্তার ২, উদ্ধার তার
প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরির ঘটনায় ইতিমধ্যেই দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—সচিবালয়ের আউটসোর্সিং কর্মী রঞ্জন চন্দ্র (২৬) এবং ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী রেজাকুল ইসলাম (৩২)।
গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গত ১ জুন সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘রেড টেলিফোন’ সংযোগটি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। তদন্তে নেমে জানা যায়, গত ২২ মে ছুটির দিনে অভিযুক্ত রঞ্জন চন্দ্র সচিবালয়ের ছাদ ও বিভিন্ন ভবনের সংযোগস্থল থেকে প্রায় ৮ কেজি ২০০ গ্রাম তামার তার কেটে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সে সেই রাষ্ট্রীয় তার ভাঙ্গারির দোকানে প্রতি কেজি মাত্র ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে দেয়। পরে সিটিটিসি টিম তল্লাশি চালিয়ে ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী রেজাকুলের গুদাম থেকে চুরি হওয়া সবটুকু তামার তার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে।
