নিজস্ব প্রতিবেদক: সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মূলত সাত সদস্যের একটি বিশেষ ‘কিচেন কেবিনেট’ গ্রহণ করত বলে চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, এই কিচেন কেবিনেটের সদস্যরা প্রতি মঙ্গলবার নিয়মিত বৈঠকে বসতেন এবং তাঁর নিজের মন্ত্রণালয়েও একাধিক উপদেষ্টার অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ছিল, যার কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেও তা গৃহীত হয়নি।
তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করেন যে, অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও উচ্চপর্যায়ের আশকারা পাওয়ায় ওই উপদেষ্টাদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হতো। বারবার সরকারের ভেতর তৈরি হওয়া এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির কারণে তিনি তিনবার সরে দাঁড়ানোর চিন্তা করলেও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত থেকে যান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ‘ডিপ স্টেট’ বা পর্দার অন্তরালের শক্তির সক্রিয়তা নিয়ে সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, বিশ্বের সব বড় ঘটনার পেছনেই ডিপ স্টেট জড়িত থাকে। তারা সাধারণত স্রোতের বিপক্ষে যায় না, বরং চলমান কোনো পরিস্থিতিকে নিজেদের অনুকূলে ম্যানিপুলেট বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।
সরকারে থাকার সময় নিজের প্রত্যাশার একটি বড় অংশই পূরণ হয়নি জানিয়ে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, যমুনায় এক বিশেষ উপলক্ষে কিচেন কেবিনেটের বৈঠকে যোগ দিয়ে তিনি জানতে পারেন যে প্রতি মঙ্গলবার তারা গোপনে বসতেন। এর আগে শুধু গুঞ্জন শুনলেও সুনির্দিষ্টভাবে এমন একটি গ্রুপের নিয়মিত নীতিনির্ধারণী বৈঠকের বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত জানা ছিল না।
গত নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি করেছিল, তার সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না বলে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, চুক্তিটির পেছনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং কোনো অদৃশ্য বাধ্যবাধকতার কারণেই নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে তড়িঘড়ি করে এটি সই করা হয়েছিল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে চিঠি পাঠানো প্রসঙ্গে তিনি অকপটে স্বীকার করেন, দায়িত্বের খাতিরে চিঠি দিলেও কূটনৈতিক বাস্তবতায় এটি যে কোনো কাজে আসবে না তা তিনি আগে থেকেই জানতেন।
একই সঙ্গে নিষিদ্ধ হওয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে নিজের ব্যক্তিগত ভাবনা প্রকাশ করেছেন এই সাবেক উপদেষ্টা। তৌহিদ হোসেনের মতে, দেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব দীর্ঘ নয়, তাই আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে চিরতরে হারিয়ে যাবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, দলটি আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হবে এবং তাঁর অনুমান অনুযায়ী আগামী জাতীয় নির্বাচনেও তারা অংশ নেবে।
বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার নিয়ে এখনই কোনো চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে নারাজ এই অভিজ্ঞ কূটনীতিক। তবে তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোকে সমানভাবে সামলানোই এখন তারেক রহমানের জন্য সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
