চ্যানেল ফোরটিন ডেস্কঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গন এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এই সময়ে দুই হাজারের বেশি শিল্পী, সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী মব সহিংসতা, হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছেন লোকজ সংস্কৃতির ধারক বাউল, সুফি এবং পালাগান শিল্পীরা। ২০২৫ সালে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ৭০ বছর বয়সী বাউল হালিম উদ্দিন আকন্দের চুল-দাড়ি জোরপূর্বক কেটে দেওয়ার ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। এ ছাড়া মানিকগঞ্জ ও ঠাকুরগাঁওয়ে বাউলদের সমাবেশে ‘তৌহিদি জনতা’র ব্যানারে হামলা চালিয়ে শিল্পীদের রক্তাক্ত করার খবর পাওয়া গেছে। ।
বাংলাদেশ বাউল সমিতির মহাসচিব মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জানিয়েছেন, সারা দেশে প্রায় দুই হাজার বাউলশিল্পী ও সংগঠক হামলার শিকার হয়েছেন এবং অনেকের নামে মিথ্যা হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। শিল্প-সংস্কৃতির ওপর এই আঘাতের বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচিত হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা এমপি ফজলুর রহমান সংসদ অধিবেশনে বলেন, “ইউনূস সরকারের সময় একটি গান হতে পারেনি, একটি বাউল গান হতে পারেনি; সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছে।” ।
মঞ্চনাটক ও চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বরাও এই রোষানল থেকে রেহাই পাননি। একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ এবং মামুনুর রশীদের মতো গুণী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। শিল্পকলা একাডেমির সামনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের অনুষ্ঠানে মামুনুর রশীদের ওপর ডিম ছোড়া ও হামলার ঘটনা সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ।
রুপালি পর্দার তারকাদের মধ্যে নুসরাত ফারিয়া ও সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া ফেরদৌস আহমেদ, রিয়াজ, চঞ্চল চৌধুরী, শমী কায়সারসহ শতাধিক অভিনয়শিল্পীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। চারুকলা অঙ্গনেও মব হামলার আতঙ্ক ছড়িয়েছে, যার শিকার হয়েছেন প্রখ্যাত শিল্পী রফিকুন নবী ও ভাস্কর রাসা। ।
সংগীত জগতেও নেমে এসেছে দুর্যোগ। জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জলের গান’-এর প্রধান রাহুল আনন্দের ধানমন্ডির বাসভবনে হামলা চালিয়ে তিন শতাধিক বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ দাবি করেছেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা-মামলাগুলো চালানো হয়েছে। ।
যদিও সরকারের পক্ষ থেকে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল স্বীকার করেছেন যে, ‘মব ঠেকানোর ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি,’ তবে সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করেন এই নীরবতা ছিল উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রতি এক ধরনের পরোক্ষ প্রশ্রয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন এবং দেশে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
