নিজস্ব প্রতিনিধি
গত দুই বছরে দেশের সরকারি প্রশাসনে কর্মরত এবং গোপালগঞ্জ নিবাসী তিন হিন্দু কর্মকর্তার মৃত্যু ও খুনের ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নিহত এই তিনজনের মধ্যে পেশাগত মিলের পাশাপাশি তাদের ধর্মীয় ও আঞ্চলিক পরিচয় একই হওয়ায় বিষিয়টি নিয়ে সচেতন মহলে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। কেন নির্দিষ্ট একটি অঞ্চল ও বিশেষ সম্প্রদায়ের কর্মকর্তারা এভাবে চরম রহস্যের মধ্যে প্রাণ হারাচ্ছেন, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন তাদের স্বজন ও সহকর্মীরা।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে নিহত এই তিনজনই ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ এবং গোপালগঞ্জ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। বিশেষ করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই হার অবিশ্বাস্যরকমভাবে বেড়েছে।
সর্বশেষ গতকাল কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় ৪১তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে প্রশিক্ষণ শেষে ফেরার পথে নিখোঁজ হওয়া এই কর্মকর্তার মৃত্যু অত্যন্ত পরিকল্পিত বলে দাবি করছে তার পরিবার।
এর আগেও গত দুই বছরের ব্যবধানে আরও দুইজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং গোপালগঞ্জ নিবাসী কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা এবং কেউ ছিলেন বেসামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে।
নিহত এই কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনটি অভিন্ন মিল পাওয়া যাচ্ছে, তারা সবাই সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। তারা সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু সম্প্রদায়ের। তাদের সবারই স্থায়ী ঠিকানা গোপালগঞ্জ জেলায়।
এই কাকতালীয় বিষিয়টি সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এটি কি নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তু হওয়ার বিষয় রয়েছে—তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এখন একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। গত দুই বছরে এই ধরনের সুনির্দিষ্ট প্রোফাইলের কর্মকর্তাদের টার্গেট করার পেছনে কারণ কী? বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না কেন?
নিহতদের পরিবারগুলো একে নিছক মৃত্যু হিসেবে মানতে নারাজ। তাদের মতে, মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের হারিয়ে ফেলার এই ধারাটি যদি রহস্যের আড়ালেই থেকে যায়, তবে প্রশাসনে কর্মরত অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এসব রহস্যজনক মৃত্যুর বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, প্রতিটি ঘটনারই তদন্ত চলছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং তদন্ত প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ কোনো অঞ্চল বা ধর্মের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংহতির জন্য হুমকিস্বরূপ। তাই দ্রুত স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে এসব খুনের রহস্য উন্মোচন করা জরুরি।
