নিজস্ব প্রতিনিধি
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় যাতায়াতের রাস্তায় প্রাচীর তুলে ২৫ হিন্দু জেলে পরিবারকে অবরুদ্ধ করার অভিযোগ পাওয়ার পর প্রশাসন দুপক্ষকে নিয়ে বসে রাস্তাটি খোলার ব্যবস্থা করেছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লিংকন বিশ্বাস শুক্রবার বলেন, উপজেলার লক্ষ্মীপাশা গ্রামের মালোপাড়ায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের বিরোধের ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধান হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মঙ্গলবার বিকাল ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সমঝোতা বৈঠকে আলোচনার পর বিবাদমান পক্ষগুলো চলাচলের রাস্তা খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হন।
লিংকন বিশ্বাস বলেন, “আশা করছি, এর মাধ্যমে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে এবং এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকবে।”
তার সভাপতিত্বে এ সভায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. কামরুজ্জামান, লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী আক্তার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুম্মিতা সাহা, মালোপাড়ার জেলেপাড়ার প্রতিনিধি, পাশের জমির মালিক ব্যারিস্টার দেদার-ই-এলাহীর পক্ষের লোকজন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর নির্দেশনা এবং জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে এই সমঝোতা বৈঠক হয়। বুধবার সকাল থেকেই প্রাচীর অপসারণের কাজ করে যাতায়াতের জন্য রাস্তাটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
রাস্তা ফিরে পেয়ে মালোপাড়ার বাসিন্দা সুশান্ত বিশ্বাস আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “আমাদের চলাচলের একমাত্র পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা কয়েকদিন চরম মানবেতর জীবনযাপন করছিলাম। প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপে আমরা অত্যন্ত খুশি এবং কৃতজ্ঞ।”
প্রশাসন, জেলে সম্প্রদায় ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই রাস্তাটি নিয়ে এর আগেও দুবার সমস্যা হয়েছিল। তখনও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে জেলে পরিবারগুলো তাদের চলাচলের রাস্তা ফিরে পায়।
জেলে পরিবারগুলোর দাবি, লক্ষ্মীপাশা মৌজার সাবেক দাগ নম্বর ২৬১ ও আরএস ২০২৮ দাগের ছয় শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে তাদের একমাত্র যাতায়াতের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত এ পথটি এসএ ও আরএস নকশা ও আরএস পর্চায় ১/১ খতিয়ানে সরকারি রাস্তা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
১৬ এপ্রিল পাশের জমির মালিক দেদার-ই-এলাহী ও তার সহযোগীরা ওই জমিতে নতুন করে প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন। তাতে গ্রামের ভেতরের বসতবাড়ির সঙ্গে ২৫টি পরিবারের যাতায়াতের সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিষয়টি নিয়ে ১৮ এপ্রিল সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।
মালোপাড়ার বাসিন্দা ভ্যানচালক ধ্রুব বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, পথ বন্ধ থাকায় তিনি ভ্যান নিয়ে বের হতে পারেননি। ঘর থেকে বের হতে না পারায় মালোপাড়ায় ২৫টি পরিবারের লোকজন ঘরে বসে থেকেছে। তাদের উপার্জনে যাওয়ার কোনো পথ ছিল না।
তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, “আমরা সংখ্যালঘু হওয়ায় আমাদের প্রতি এই নির্যাতন।”
হারান চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, দেদার-ই-এলাহী ও তার সহযোগীরা পথটি এর আগে দুবার বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রশাসনের সহায়তায় দুবার ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
স্বপ্না বিশ্বাস বলেন, পথ না থাকলে কেউ পাড়া থেকে বের হতে পারে না। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। বাঁশের মই দিয়ে কয়েকজন চলাচল করেছে। কিন্তু নারীদের পক্ষে সেটা সম্ভব না। এ কারণেই তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাশের জমির মালিক ব্যারিস্টার দেদার-ই-এলাহী সাংবাদিকদের বলেন, “ওই রাস্তাটা পাঁচ শতক। আমাদের বাড়ির সঙ্গে কেনা। এটা কোনোভাবে ‘ক’ তালিকায় চলে যায়। আদালতের মামলার পর রায় হয়েছে। সরকার আপিল করছে। সেখানে আমরা কনটেস্ট করছি। তারপর ডিসি অফিস থেকে চার-পাঁচ বছর আগে রাস্তাটি অবমুক্ত করে দিয়েছে।
“এখন যে জায়গাটা প্রাচীর দেওয়া হয়েছে, ওই জায়গা মামলার ভিতর নাই। ওখানকার জেলেরা রাস্তা চেয়ে একটি মামলা করছে। দেখবেন ওখানে একটা কামিনি ফুল গাছ ছিল। ওই পাশ দিয়ে তাদের রাস্তা ছিল। ওখান থেকে তাদের রাস্তা দেওয়া হয়েছিল।”
তিনি দাবি করেন, “নতুন যে প্রাচীর দেওয়া হয়েছে সেটি ২২৬ দাগ। এবং এটি নিয়ে কোনো মামলা নাই। উপজেলা ভূমি কার্যালয় থেকে একবার তদন্ত করা হয়েছিল। তারা গিয়ে দেখে এসেছে, তাদের বের হওয়ার দুটি রাস্তা রয়েছে। স্কুল মাঠ থেকে ১০ ফিট চওড়া একটি রাস্তা আছে। এখন তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘সংখ্যালঘু তকমা’ দিচ্ছে। আমরা তো ঢাকায় থাকি। বাড়িতে কেউ থাকে না। ওই বাড়ির সীমানায় মদ, গাঁজার আসর বসানো হয়। এই কারণে আমরা মূলত পকেট গেটটা বন্ধ করে রাখছি। এখন প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে রাস্তা অবমুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।”
