নিজস্ব প্রতিনিধি : কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল অবকাঠামো। ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন, ছয়টি বিশালাকায় স্টোরেজ ট্যাংক এবং অত্যাধুনিক পাম্পিং স্টেশন সবই প্রস্তুত। ২ লাখ টন জ্বালানি তেল মজুত করার ক্ষমতা সম্পন্ন এই ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং’ (এসপিএম) প্রকল্পটি এখন কেবলই এক স্থবির কঙ্কাল।
প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্প গত দুই বছর ধরে অলস পড়ে থেকে রোদে পুড়ছে আর বৃষ্টিতে ভিজছে, অথচ জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে দেশ।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে পরীক্ষামূলকভাবে তেল খালাস ও পরিবহন সফল হওয়ার মাধ্যমে এসপিএম প্রকল্পটি প্রযুক্তিগতভাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। কিন্তু দীর্ঘ দুই বছর পার হলেও কেবল একজন ‘অপারেটর’ বা দক্ষ ঠিকাদার নিয়োগ করতে পারেনি সরকার। বর্তমানে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের এই ধীরগতি ও অদক্ষতাকে ‘জাতীয় সম্পদের অপচয়’ বলে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাইপলাইনটি চালু থাকলে বছরে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অন্তত ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতো, যা গত দুই বছরে ১৬০০ কোটি টাকার লোকসানে পরিণত হয়েছে। এখনো সনাতন পদ্ধতিতে লাইটার জাহাজে করে তেল আনতে গিয়ে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
সম্প্রতি জানা গেছে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এসপিএম প্রকল্পের যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর ‘গ্যারান্টি পিরিয়ড’ শেষ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এখন যদি কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়, তবে তার সম্পূর্ণ মেরামত খরচ সরকারকে বহন করতে হবে। অথচ প্রকল্পটি এখনো বাণিজ্যিক উৎপাদনেই যেতে পারেনি।
এই চরম অব্যবস্থাপনার দায় কার এ নিয়ে যখন জনমনে প্রশ্ন তুঙ্গে, তখন সরকারের পক্ষ থেকে কেবল ‘প্রক্রিয়া চলছে’ বা ‘দরপত্র মূল্যায়ন হচ্ছে’ জাতীয় আশ্বাসের বাণী শোনানো হচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম ও ম. তামিমের মতে, এই বিলম্ব কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও এক বিরাট হুমকি।
গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখন জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও বিসিবি বারবার বৈঠক করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্বোধনী তারিখ দিতে পারছে না। সমালোচকরা বলছেন, নির্বাচনী নাটক ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা সংহত করার দিকে নজর দিতে গিয়ে সরকার দেশের অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো চালুর বিষয়টিকে উপেক্ষা করছে।
২ লাখ টনের মজুত সক্ষমতা সচল থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওঠানামায় বাংলাদেশ অনেক বেশি সুরক্ষিত থাকত। কিন্তু সদিচ্ছা ও উদ্ভাবনী চিন্তার অভাবে এই ৮ হাজার কোটি টাকার সম্পদ এখন কেবলই সমুদ্রতীরের এক অচল প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে।
