বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে প্রবাসে বাঙালিদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক প্রাণবন্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ আয়োজন করেছে ‘আনন্দধ্বনি–TBN24’। বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় গত ১২ এপ্রিল ২০২৬, রোববার সন্ধ্যা ৫টায় কুইন্সের কুইন্স বরো পারফর্মিং আর্টস সেন্টার (QPAC)-এ।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রবাসে বাঙালিদের অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আনন্দধ্বনি’ এক বর্ণাঢ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। নববর্ষের এই শুভক্ষণে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয় আন্তরিক শুভেচ্ছা, প্রীতি ও অভিনন্দন, পাশাপাশি তুলে ধরা হয় একটি মানবিক, শান্তিময় ও সৌন্দর্যমণ্ডিত বিশ্বের প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানের সূচনায় নববর্ষের তাৎপর্য তুলে ধরে বলা হয়, জীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের এই সময়ে আমাদের প্রত্যাশা এমন এক আগামীর, যেখানে মানবতা, সহমর্মিতা ও সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য আরও বিকশিত হবে। বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও লোকজ ঐতিহ্য কেবল সংস্কৃতির অলংকার নয়, বরং জাতিসত্তার মূল ভিত্তি এবং অস্তিত্বের শক্তি।
বিশ্বব্যাপী চলমান সংকট, সংঘাত ও বিভেদের প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতির উপর নেমে আসা হুমকির বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়। বক্তারা উল্লেখ করেন, আগ্রাসন শুধু ভূখণ্ড দখলে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানুষের ভাষা, শিল্প ও আত্মপরিচয়ের উপরও আঘাত হানে। যেখানে যুদ্ধের শব্দ প্রবল হয়, সেখানে নীরব হয়ে যায় গানের কণ্ঠ—এমন বাস্তবতায় সংস্কৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসে বাঙালি ঐতিহ্য রক্ষায় ‘আনন্দধ্বনি’র ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে সংস্কৃতির চর্চা, সংরক্ষণ ও বিকাশে কাজ করে যাচ্ছে। বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে থেকেও শেকড়ের সঙ্গে সংযোগ অটুট রাখার প্রয়াসকে সংগঠনটি তাদের অন্যতম দায়বদ্ধতা হিসেবে তুলে ধরে।
এবারের বর্ষবরণ অনুষ্ঠিত হয় ১২ এপ্রিল, যা দীর্ঘদিনের অনুশীলন ও প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনের মাঝেও শিল্পী, কলাকুশলী ও অংশগ্রহণকারীদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠা অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানে সংগঠনের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী সকল শিল্পী, পৃষ্ঠপোষক, স্বেচ্ছাসেবক এবং দর্শকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। একইসঙ্গে, যেকোনো অনিচ্ছাকৃত ত্রুটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বানও জানানো হয়।
শেষে শান্তি, সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের জয় কামনা করে বলা হয়, নতুন বছরের আলো হিংসা ও যুদ্ধের বিভীষিকা দূর করে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠা করুক শান্তির নতুন দিগন্ত—যেখানে সংস্কৃতি হবে মিলনের সেতু এবং শিল্প হবে মানবিক সংলাপের ভাষা।
অনুষ্ঠানটি স্পন্সর করেন Queens Social Adult Day Care Center Inc., যেখানে প্রবাসী বাঙালিদের বিপুল উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দিনব্যাপী ব্যস্ততার মাঝেও সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শক-শ্রোতাদের অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশনায় সহযোগিতা করে জনপ্রিয় ‘মাটি ব্যান্ড’, যারা তাদের সুর ও পরিবেশনায় দর্শকদের মুগ্ধ করে। পাশাপাশি তবলায় ছিলেন Pinusen Das, Amit Das, Swapan Datta এবং Haradhan Karmaker—তাদের তাল ও লয়ের অনন্য পরিবেশনা পুরো অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করে।
অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন আনন্দধ্বনি ইনক. নিউইয়র্কের ডিরেক্টর অর্ঘ্য সারথী সিকদার। তার নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও অনুশীলনের মাধ্যমে এই আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
প্রবাসে থেকেও শুদ্ধ ও সুস্থ সংস্কৃতি ধারণ ও চর্চার আহ্বানের মধ্য দিয়েই শেষ হয় ‘আনন্দধ্বনি’র এবারের নববর্ষ উদযাপন।
