নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সারাদিন এত পোস্ট দিতে থাকি যে অনেক পোস্টের দিকে নজর দিতে পারি না। গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্কুলার দিয়ে করা পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। অনেকে আমাকে ইনবক্সে জানিয়েছেন আবেদন করতে চান, কী করলে ভালো হবে, আমার পরিচিত কেউ আছে কিনা।
গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার পরিচিত কেউ নেই। আবেদন করবেন কিনা সেটি আপনার চয়েস। আমি আপনার জায়গায় হলে আবেদন করতাম। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতাদের মতো স্বার্থপর আর কেউ হয় না। তারা আন্দোলনে আপনাকে ব্যবহার করবেন, মিছিলের গুলিটা আপনার বুকে লাগাবেন, তারপর আপনার লাশ নিয়ে রাজনীতি করবেন। কিন্তু আপনার জন্য একটি সৎপথে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন না। তারা নিজেদের চেয়ার কোনদিন অন্যের জন্য ছাড়বে না। যে কারণে তারা নিজেদের জীবদ্দশায় রাজনীতি থেকে রিটায়ার করেনন না। আজীবন নির্বাচন করতে থাকেন, অন্য কোন যোগ্য ব্যক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করেন না। সুতরাং, আপনার বেঁচে থাকার লড়াইটা আপনার নিজের।
দ্বিতীয়ত, চাকরি আর রাজনীতি এক নয়। আমরা সবাই জাতীয় নির্বাচনে বেশিরভাগ সময় প্রতীক দেখে ভোট দেই। অর্থাৎ কোন না কোন দলের সমর্থক, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতি করি। কিন্তু তারপরও সরকারি চাকরিতে পছন্দের দল ক্ষমতায় না থাকলে চাকরি ছাড়ি না। বরং সরকারকে সহযোগিতা করি। এবং এটাই সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব। সুতরাং, আপনি যে কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেও বিপরীত দলকে সমর্থন জানাতে পারবেন।
তৃতীয়ত, আপনি চাকরি না করলে এই পদ পড়ে থাকবে না। কেউ না কেউ ঠিকই চাকরি করবে। আবার এখানে আবেদন না করার জন্য আপনাকে ডেকে নিয়ে কেউ পুরস্কৃত করবে না। সুতরাং, প্রথমে নিজের পায়ের নিচের মাটি শক্ত করতে হবে। তারপর অন্যকে সাপোর্ট দিতে হবে।
বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক পলিসি পরিবর্তন হয়। গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমানে মালিকানা সরকারের জন্য কমানো হয়েছে। ভবিষ্যতে বাড়বে না এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। আবার এই প্রতিষ্ঠান যে অনন্তকাল চলবে এমন কোন গ্যারান্টিও দেওয়া যায় না।
তবে চাকরি করার আগে আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী আপনি বেতন পাচ্ছেন কিনা সেটি বিবেচনা করবেন। গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক তাদের কর্মীদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করায়, কিন্তু তাদের ন্যায্য মজুরি দেয় না। এক সময় গ্রামীণ ব্যাংকের কেন্দ্র পরিচালক, যার দায়িত্ব ছিল কিস্তি সংগ্রহ করা, ৩০০০ টাকার মতো বেতন পেতেন, সেই টাকায় বউ বাচ্চাসহ সংসার চালাতে হতো। আড়ংয়ের কর্মীরা নাম মাত্র পারিশ্রমিক পায়, কিন্তু তাদের হাতের কাজের পণ্য আকাশ ছোঁয়া দামে বিক্রি হয়।
গ্রামীণ ব্যাংক তার ঋণ গ্রহিতার সাথে যে অমানবিক আচরণ করেছে আমি তার সাক্ষী। আমি দেখেছি কীভাবে ক্ষুদ্র ঋণের নামে ব্রেনওয়াশ করে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা তাদের সম্পদ তৈরি করেছে। অন্যদিক, ঋণ গ্রহিতারা আজীবন ঋণের জালে জর্জরিত থেকেছে, ক্ষুদ্র ঋণ থেকে রেগুলার ঋণ গ্রহণের দিকে নিজেদের উন্নিত করতে পারেনি। সুতরাং, আমি ব্যক্তিগতভাবে গ্রামীণ ব্যাংকসহ সকল ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের বিপক্ষে থাকবো যদি না তারা তাদের পলিসি পরিবর্তন না করেন।
এনজিওগুলো সারাদিন মানবাধিকারের কথা বলে। কিন্তু তারা সবচেয়ে বেশি তাদের কর্মচারী, কর্মীদের সাথে অমানবিক আচরণ করে। আপনার পরিশ্রম যত্রতত্র বিতরণ না করাই ভালো। চাকরিতে যোগদানের শুরুতে নিজেকে ট্রেডইন করারটা ঠিকভাবে জাস্টিফাই করুন।
সুতরাং, জীবন আপনার, সিদ্ধান্ত আপনারই।
