জিইডি’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশে কৃষিখাতে বছরে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এতে বড় ধরনের খাদ্য অপচয়, জমির ওপর চাপ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং যান্ত্রিকীকরণ, বীমা ও সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষিখাত জলবায়ুজনিত ঝুঁকির কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছে—পরিকল্পনা কমিশনের জেনারেল ইকোনমিকস ডিভিশন (GED) কর্তৃক পরিচালিত কৃষি রূপান্তর বিষয়ক সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির পাশাপাশি এই খাতটি আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং সীমিত বাস্তবায়ন সক্ষমতার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি।
প্রতিবছর দুর্বল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার কারণে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টন খাদ্য নষ্ট হয়, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় আমে—মোট ক্ষতির ৩৫ শতাংশ। এরপর রয়েছে পেঁয়াজ ও সবজি ২৫ শতাংশ, আলু ২০ শতাংশ এবং ধান ১২ শতাংশ।
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় ধানই প্রধান ফসল, যা আবাদযোগ্য জমির ৭৫ শতাংশ জুড়ে রয়েছে এবং দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করে। ১৯৭১ সালে যেখানে প্রতি হেক্টরে ধানের উৎপাদন ছিল ১.৭ টন, তা বেড়ে ২০২৩ সালে ৪.৮ টনে পৌঁছেছে।
দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল, ফলে এটি এখনও সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের উৎস, যদিও জিডিপিতে এর অবদান কমছে। কৃষি শ্রমিকদের মজুরিও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে—২০১৫ সালে দৈনিক ৩০০ টাকা থেকে ২০২৪ সালে তা ৫৮৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে এখনো এই খাতে ৯৯ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক।
নগরায়ন ও শিল্পায়নের বিস্তারের ফলে কৃষিজমি ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, যা প্রতি বছর প্রায় ০.৫ শতাংশ হারে সংকুচিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,২৬৫ জন মানুষের বসবাস, যা কৃষি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, জমি প্রস্তুত ও সেচের ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি যান্ত্রিকীকরণ হলেও রোপণ ও ফসল কাটার ক্ষেত্রে যন্ত্রের ব্যবহার এখনও সীমিত।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় GED কয়েকটি কৌশলগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—যান্ত্রিক রোপণ, ফসল কাটা ও সৌর সেচের মতো অব্যবহৃত প্রযুক্তির প্রসার, ফসল কাটার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিঋণের শর্ত নির্ধারণ এবং কৃষকদের আর্থিক শিক্ষার উন্নয়ন।
এছাড়া ভর্তুকির অপব্যবহার রোধে তদারকি জোরদার, ঝুঁকি কমাতে ফসল বীমা সম্প্রসারণ এবং আলুর বাইরে ফল ও সবজির জন্য কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণায় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর ঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমানে একজন কর্মীকে ৯০০ থেকে ২,০০০ কৃষকের দায়িত্ব পালন করতে হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এই সংখ্যা হওয়া উচিত প্রতি ৪০০ কৃষকের জন্য একজন। এই মান অর্জনে বাংলাদেশে অতিরিক্ত ৫,০০০ সম্প্রসারণ কর্মী প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রে একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা দুই থেকে তিনটি ব্লকের দায়িত্ব পালন করছেন।
কৃষিখাতের রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে একটি তিনস্তরবিশিষ্ট মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বিদ্যমান কৃষিসেবা জোরদার করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সেবা সম্প্রসারণ এবং উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সম্প্রসারণ সেবা, কৃষি উপকরণ, ঋণ ও বাজার সহায়তা সমন্বিত করার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি আরও গুরুত্ব দিয়েছে প্রযুক্তির বিস্তৃত ব্যবহার, ফসলের বহুমুখীকরণ, উন্নত বাজারব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি পদ্ধতি এবং কৃষি গবেষণার কার্যকর পর্যবেক্ষণের ওপর।
