নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ডা. জাহেদ উর রহমান পড়েছেন এমবিবিএস। পেশায় হয়েছেন শিক্ষক। কি কোর্স পড়ান, গবেষণা প্রফাইল কী এসব নিয়ে অবশ্য কোনদিন কিছু জানতে পারলাম না। পত্রিকায় লেখেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। টকশোতে বসে ইতিহাসের লেখক। সরকারের হয়েছেন তথ্য সম্প্রচার উপদেষ্টা। এক কথায় একের ভেতর বহু।
এই একের ভেতরে বহু হওয়ার সমস্যা আছে। সমস্যা হলো তিনি কোন বিষয়ে ভালো করে এক্সপার্টিস তৈরি করতে পারেননি। পত্রিকার নিউজ পড়ে এবং কে কী বলেছেন সেটি মুখে প্রচার করাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলে না, জনাব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক হতে হলে পলিটিক্যাল ফিলোসফি পড়তে হবে। থিওরি পড়তে হবে, সেগুলোর ভিত্তিতে এনালিসিস করতে হবে। সেগুলো না জানলে এমন উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিতে ইচ্ছে করবে। আপনি বরং নিজের কাজটি ঠিক মতো করুন।
আসুন আমরা পলিটিক্যাল ফিলোসফির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুইজন দার্শনিক, জন রলস এবং রবার্ট নজিক এ বিষয়ে কী বলবেন সে বিষয়ে একটু আলোচনা করি।
Robert Nozick তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Anarchy, State, and Utopia-এ ন্যায়বিচারের একটি প্রভাবশালী তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যা “entitlement theory” নামে পরিচিত। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো সম্পদ বা সুবিধা তখনই ন্যায্য, যখন তা ন্যায্য অর্জন (just acquisition), ন্যায্য হস্তান্তর (just transfer), এবং প্রয়োজনে অন্যায়ের সংশোধন (rectification) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে। নজিকের কাছে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি ফলাফল (কে কত পেল) দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় প্রক্রিয়া (কীভাবে পেল) দিয়ে। তাই তিনি যে কোনো ধরনের “patterned distribution” বা ফলাফল-নির্ভর সমতার ধারণার সমালোচনা করেন এবং বলেন, মানুষের স্বাধীন পছন্দ ও লেনদেনের ফলে যে বৈষম্য তৈরি হয়, তা অন্যায় নয়, যদি সেই প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছাসম্মত ও ন্যায্য হয়।
এই তাত্ত্বিক অবস্থান থেকে বিসিএস অফিসারদের সুযোগ-সুবিধা কমানোর প্রস্তাবটি ত্রুটিপূর্ণ ধারনার উপর প্রতিষ্ঠিত। যদি ধরে নেওয়া হয় যে এই কর্মকর্তাগণ একটি উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের অবস্থান অর্জন করেছেন এবং তাদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা রাষ্ট্রীয় নীতিমালার মাধ্যমে বৈধভাবে নির্ধারিত, তাহলে সেই সুবিধাগুলো কেবল “বৈষম্য কমানো”র উদ্দেশ্যে কমিয়ে দেওয়া নজিকের দৃষ্টিতে ন্যায্য নয়। কারণ, এতে ফলাফলের সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যক্তির বৈধভাবে অর্জিত অধিকার খর্ব করা হয়। নজিক স্পষ্টভাবে দেখান যে, এই ধরনের পুনর্বণ্টনমূলক পদক্ষেপ অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির শ্রম ও অধিকারের ওপর জোরপূর্বক হস্তক্ষেপের সমতুল্য।
অতএব, নজিকের তত্ত্ব অনুযায়ী মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত-এই সুবিধাগুলো কি কোনো অন্যায় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে? যদি হয়ে থাকে, তবে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু যদি তা বৈধ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ফল হয়, তাহলে কেবল সামাজিক বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যে সেই সুবিধা কমানো নৈতিকভাবে সঙ্গত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বিসিএস কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা হ্রাসের প্রস্তাবটি ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে, জন রলস তাঁর A Theory of Justice-এ “veil of ignorance” ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন, ন্যায়বিচার নির্ধারণ করতে হলে আমাদের এমন অবস্থান থেকে ভাবতে হবে, যেখানে আমরা জানবো না সমাজে আমাদের অবস্থান কী, ধনী না গরিব, ক্ষমতাবান না প্রান্তিক। এই অবস্থান থেকে মানুষ সাধারণত এমন নীতিই বেছে নিবে, যা সবচেয়ে দুর্বলদের অবস্থার উন্নতি নিশ্চিত করে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি বিসিএস কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা সমাজে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করে এবং সেই বৈষম্য সমাজের সবচেয়ে বঞ্চিত মানুষদের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে রলসের “difference principle” অনুযায়ী সেই সুবিধা কমানো ন্যায়সঙ্গত হতে পারে। কারণ, রলসের মতে বৈষম্য তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সমাজের সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের কল্যাণে কাজ করে।
তবে রলস একবাক্যে “সব সুবিধা কমিয়ে দাও” বলবেন না। তিনি দেখবেন, এই সুবিধাগুলো কি সমাজের সামগ্রিক কাঠামোতে এমনভাবে কাজ করছে, যা দক্ষতা, প্রেরণা এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত সবার, বিশেষ করে দুর্বলদের, উপকার করছে? যদি করে, তাহলে কিছু বৈষম্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু যদি এই সুবিধা শুধু একটি গোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করে, এবং তা সমাজের নিচের স্তরের মানুষের অবস্থার উন্নতিতে কোনো ভূমিকা না রাখে, তাহলে তা ন্যায়সঙ্গত নয়।
