পঞ্চাশ বছর পরে ফিরে এসে নিজের তৈরি ব্যাংকে নিজের সংবর্ধনা নেওয়াটা একটা বিশেষ রকম সাহসের কাজ। বিশেষত যখন ওই পঞ্চাশ বছরের হিসাবটা ঠিকঠাক মেলানো যাচ্ছে না।
গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ মডেল নিয়ে পশ্চিমা মিডিয়া এবং নোবেল কমিটি যে রূপকথাটা তৈরি করেছে, সেটার ভেতরে একটু ঢুকলেই দেখা যায় ফাঁকগুলো কোথায়। ব্যাংকটির ফ্ল্যাট রেট হিসাবে সুদ দেখানো হয় ২০ শতাংশের আশপাশে, কিন্তু ডিক্লাইনিং ব্যালেন্স পদ্ধতিতে হিসাব করলে কার্যকর সুদের হার দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে। যে মানুষটা সুদখোর মহাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর গল্প বলে নোবেল নিলেন, তাঁর ব্যাংকই আরেক ধরনের সুদের ফাঁদ তৈরি করেছে কিনা, এই প্রশ্নটা কিন্তু অনেক আগে থেকেই উঠছে। নরওয়ের গবেষক টমাস পরেলো এবং মিলফোর্ড ব্যাটম্যানের মতো অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে দেখিয়ে আসছেন যে ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য কমানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রে ঋণনির্ভর একটা অর্থনীতি তৈরি করে, যেখান থেকে বের হওয়াটা ঋণগ্রহীতার পক্ষে আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১০ সালে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন এনআরকে একটা তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দেখানো হয় যে নরওয়ে সরকারের দেওয়া প্রায় ১০ কোটি ডলার অনুদান গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অন্য একটি সংস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, অনুদানদাতার সম্মতি ছাড়াই। এটা নিয়ে নরওয়ে সরকার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে। ইউনূস পরে অর্থ ফেরত দেন এবং বলেন ট্যাক্স এড়াতে এটা করা হয়েছিল। ট্যাক্স এড়ানোর জন্য একটা দাতব্য সংস্থার অনুদানের অর্থ সরিয়ে নেওয়া, এটাকে কোন ভাষায় বলা উচিত সেটা পাঠকের বিবেচনায় রইল।
২০১১ সালে তাঁকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরানোর পর তিনি হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ পর্যন্ত গেছেন। সর্বোচ্চ আদালত তাঁর বিপক্ষে রায় দিয়েছেন। বয়সসীমার নিয়ম মেনে চলা একটা অবিশ্বাস্য দাবি হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে, অথচ ওই নিয়ম তাঁর আমলেই তৈরি। এরপর তেরো বছর তিনি ব্যাংকের দিকে ফিরে তাকাননি। এখন সেখানে ফুলের মালা নিয়ে হাজির হওয়াটা আবেগের দৃশ্য হিসেবে ভালোই লাগে, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকে দেখলে এটা স্পষ্টতই একটা পারফরম্যান্স।
শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিকদের লভ্যাংশ ও ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়ে। এটাকে তাঁর সমর্থকরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে উড়িয়ে দেন, কিন্তু যে শ্রমিকদের পাওনা মেটানো হয়নি, তাদের কথা এই আখ্যানে কোথাও নেই।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন তাঁর বয়স ৮৪। দেশের অর্থনীতি তখন চাপে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থির। তাঁর সরকারের প্রায় দেড় বছরে নির্বাচনের কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ আসেনি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বিনিয়োগ পরিবেশ আরও খারাপ হয়েছে। অথচ এই পুরো সময়ে দেশে-বিদেশে তাঁর ভাবমূর্তি রক্ষার কাজটা চলেছে পুরোদমে। দাভোসে গেছেন, বিদেশে বক্তৃতা দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। দেশের ভেতরে কী হচ্ছে সেটার চেয়ে বাইরে কেমন দেখাচ্ছে সেটা তাঁর কাছে সবসময়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে হয়।
একজন মানুষ নোবেল পাওয়ার পরে অপ্রতিরোধ্য হয়ে যান না। প্রশ্নের বাইরে চলে যান না। পঞ্চাশ বছরের উদযাপনের এই মুহূর্তে আসল প্রশ্নটা হলো, গ্রামীণ ব্যাংকের লক্ষ লক্ষ নারী ঋণগ্রহীতা কি আসলেই স্বাবলম্বী হয়েছেন, নাকি একটা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণচক্রের নির্ভরযোগ্য গ্রাহক হয়েছেন? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেয়ে ফটোসেশন করা অনেক সহজ, সেটা অবশ্য সত্যি।
