নিজস্ব প্রতিনিধি
দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মব সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত প্রায় ১৯ মাসে এ ধরনের সহিংসতা শুধু ধর্মীয় সম্প্রীতিই নয়, দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ওপরও গুরুতর আঘাত হেনেছে।
সর্বশেষ গত শনিবার কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ‘পীর’ শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে (৬৫) পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় তাঁর আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ‘মব সন্ত্রাস’, ‘গণপিটুনি’ এবং মাজারকেন্দ্রিক হামলার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটায় পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা আরও বেড়েছে। কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে মব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে শতাধিক মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে আলী পাগলার মাজারে হামলার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন জেলায় এমন ঘটনা ঘটছে।
২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘নুরাল পাগলা’র কবর থেকে মরদেহ তুলে পুড়িয়ে ফেলার নৃশংস ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। হামলায় অর্ধশতাধিক আহত হন এবং একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এখনো ওই পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এ ছাড়া কুমিল্লার হোমনা উপজেলার একাধিক মাজারে হামলা, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে প্রাচীন মাজারে ভাঙচুর ও অপবিত্রতা সৃষ্টি, ঠাকুরগাঁওয়ে একই রাতে চারটি মাজারে হামলা—এসব ঘটনায় সার্বিক পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাকাম-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিভাগেই অর্ধশতাধিক মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নরসিংদীতে সর্বাধিক ১১টি, রাজধানীতে ৯টি এবং নারায়ণগঞ্জে ৫টি হামলার ঘটনা রয়েছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৮০ জন আহত ও দুজন নিহত হয়েছেন।
একই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭টি মাজারে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। কুমিল্লায় সর্বাধিক ১৭টি হামলা সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারেও একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার পেছনে ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, জমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাও হামলাকারীদের উৎসাহিত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মাজারে হামলা, বাউলশিল্পীদের ওপর নির্যাতন, প্রাণনাশের হুমকি ও মব সহিংসতা রোধে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাজারে হামলার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নয়। একটি গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ধারার বিরোধিতা করছে, আবার অন্য একটি সুযোগসন্ধানী চক্র এসব ঘটনার আড়ালে ফায়দা লুটছে। সরকার চাইলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, কোনো হামলার খবর পাওয়া মাত্রই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেক ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং কিছু ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। অপরাধকে অপরাধ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন হবে।
