নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শের বুলি আওড়ানো বিএনপি এবার বড় ধরনের কেলেঙ্কারির মুখে পড়েছে। দীর্ঘ চার দশক ধরে দলের জন্য ঘাম ঝরানো নেত্রীরাই এখন দলের ভেতরের ‘মনোনয়ন সিন্ডিকেট’-এর বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ তুলছেন। সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি পদ পাইয়ে দিতে ১২ কোটি টাকার দাবি এবং উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা আগাম হাতিয়ে নেওয়ার নীল নকশা ফাঁস করে দিয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফাতেমা বাদশা।
চট্টগ্রামের এই প্রবীণ নেত্রীর অভিযোগের পর রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি কি রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে আছে, নাকি এটি এখন ‘মনোনয়ন বিক্রির হাটে’ পরিণত হয়েছে?
একটি ইংরেজি দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফাতেমা বাদশা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে একটি বিশেষ চক্র মাইক্রোবাসে করে চট্টগ্রামে গিয়ে তাঁর কাছে সংরক্ষিত আসনের মনোনয়নের বিনিময়ে ১২ কোটি টাকা দাবি করে।
শুধু তাই নয়, টাকা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে তাঁকে দেওয়া হয় আরও জঘন্য এক প্রস্তাব। চক্রটি জানায়, তিনি এমপি হতে পারবেন যদি আগেভাগেই এমন কিছু নথিতে সই করেন। যার মাধ্যমে তাঁর নামে বরাদ্দ হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের সব টাকা ওই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অর্থাৎ, জনগণের সেবার জন্য বরাদ্দকৃত টাকা লুটপাটের একটি প্রাতিষ্ঠানিক গ্যারান্টি চাওয়া হয়েছে দলের ভেতর থেকেই।
ফাতেমা বাদশার ভাষায়,
“আমি পুতুল ছাড়া কিছুই থাকতাম না। আমার হাত-পা বাঁধা থাকত। রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য এটা নয়।”
চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত বাদশা মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বাদশা প্রায় ৪০ বছর ধরে দলের দুঃসময়ে কাজ করেছেন। নিজের টাকা খরচ করে সংগঠনকে শক্তিশালী করলেও আজ তিনি বঞ্চনার শিকার। তিনি অভিযোগ করেছেন, দলে এখন একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’ সক্রিয়। যারা যোগ্য ও নিষ্ঠাবানদের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে যে, চট্টগ্রাম বিভাগে স্থানীয় নেতাদের চেয়ে অন্য জেলার নেতাদের প্রভাব বেশি। চট্টগ্রামের রাজনীতি এখন বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। যা দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রহীনতা ও বিশৃঙ্খলারই বহিঃপ্রকাশ।
এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলেও বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যে কোনো তাপ-উত্তাপ নেই। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ ওমরাহ পালনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেছেন। অন্যদিকে সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান উল্টো অভিযোগকারীর ওপরই দোষ চাপানোর চেষ্টা করেছেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীমের ‘মন্তব্য করতে অস্বীকার’ করা প্রমাণ করে যে, দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই মনোনয়ন বাণিজ্যের শেকড় অনেক গভীরে। তৃণমূলের কর্মীরা মনে করছেন, তদন্ত না করে বিষয়টি চেপে যাওয়া মানেই হলো এই চাঁদাবাজির সঙ্গে প্রভাবশালীদের যোগসাজশ থাকা।
আগামী ১২ মে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন। ৩৬টি আসনের বিপরীতে অসংখ্য প্রার্থী মনোনয়ন পেতে মরিয়া। কিন্তু ফাতেমা বাদশার এই জবানবন্দি প্রমাণ করে যে, সাধারণ নেত্রীদের জন্য মনোনয় পাওয়া এখন সোনার হরিণ। যদি না তাদের পেছনে কোটি কোটি টাকার জোগান থাকে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যারা ভোটের আগেই ১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বা উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা লুটের চুক্তি করে এমপি হতে চান। তারা জনগণের অধিকার নিয়ে সংসদে কথা বলবেন এমনটা আশা করা নিছক বোকামি। বিএনপির এই কথিত ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’ দলটির নৈতিক দেউলিয়াপনারই চূড়ান্ত প্রমাণ।
