ড. মাসুদার রহমান, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রশ্ন সামনে এসেছে—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তা কি একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ, নাকি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল?
২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাসের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হয়। এই সংশোধনের ফলে প্রথমবারের মতো কোনো সংগঠনের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত হয়েছে, যার আওতায় বিচার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা এ ধরনের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। তারা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তুলনামূলকভাবে সংযত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে, ক্ষমতায় এসে একই সিদ্ধান্তকে আইনি রূপ দেওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় রাজনৈতিক ইউ-টার্ন—যা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অনেকেই মনে করেন গনতন্ত্রের জন্য এই সিদ্ধান্ত “আত্মঘাতী” হতে পারে। একটি বড় ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। এতে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। ইতিহাসও বলে, রাজনৈতিকভাবে দমন করা শক্তি অনেক সময় সহানুভূতি অর্জন করে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে।
এখানে একটি মৌলিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি ঐতিহাসিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অবদান অস্বীকার করা যায় না। একইসঙ্গে, যেকোন অপরাধ — যেকোনো ব্যক্তিই করুক না কেন — তার নিরপেক্ষ বিচার হওয়াই ন্যায়বিচারের দাবি। কিন্তু একটি দলকে সামগ্রিকভাবে নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করে। কোন দল থাকবে, কোন দল থাকবে না—এই সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল চেতনার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অন্যদিকে, অনেকে এই পদক্ষেপকে কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখছেন। তাদের মতে, ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা একটি বাস্তবতা। সরকার যদি মনে করে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত প্রয়োজন, তবে তা একটি প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে, এটি সমর্থকদের কাছে শক্ত নেতৃত্বের বার্তা দিতে পারে এবং রাজনৈতিক ভিত্তিকে সংহত করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে পুরো বিষয়টির কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব—গণতান্ত্রিক আদর্শ বনাম ক্ষমতার রাজনীতি। গণতন্ত্রের মূল চেতনা হলো সব রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যেখানে ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং জনগণের রায়ে নির্ধারণ করা হয়। বাস্তবতা হলো, ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক সময় এই নীতির ব্যত্যয় ঘটে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে, এই সিদ্ধান্তকে এককভাবে “আত্মঘাতী” বা “দূরদর্শী”—কোনো একটি বিশেষণে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। স্বল্পমেয়াদে এটি রাজনৈতিক সুবিধা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নির্ভর করবে জনমত, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিমত্তার ওপর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—টেকসই স্থিতিশীলতা আসে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লাভের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্বার্থ ও জনগণের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়াই হবে সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ।
