সাগরে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস ও মজুত করার আধুনিক সক্ষমতা তৈরিতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ করেছিল শেখ হাসিনা সরকার। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অদক্ষতার কারণে গত ১৯ মাস যাবত ৮ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প অলস ফেলে রেখেছিল ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
মহেশখালীতে নির্মিত এই অবকাঠামোতে বর্তমানে দেশের প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল ও এক সপ্তাহের ডিজেলের মজুত রাখার সক্ষমতা থাকলেও ছয়টি বিশাল তেলের ট্যাংক এখন শূন্য পড়ে আছে।
প্রকল্পের সক্ষমতা ও গুরুত্ব: বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল সরাসরি খালাসের জন্য বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন এবং ২ লাখ টন তেলের মজুত রাখার স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়। এই সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং (এসপিএম) ব্যবস্থা চালু থাকলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার কথা ছিল।
সনাতন পদ্ধতিতে ১ লাখ টন ক্রুড তেল খালাসে যেখানে ১১ দিন সময় লাগে, পাইপলাইনের মাধ্যমে তা মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় সম্ভব। তেলের বাজারে চলমান অস্থিরতা ও সংকটের সময়ে এই মজুত সক্ষমতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
কেন চালু হয়নি এই মেগা প্রকল্প? আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষ বিধান আইনের আওতায় চীনের সহযোগিতায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। নির্মাণ শেষে এর অপারেশন ও মেইনটেনেন্সের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছিল তৎকালীন সরকার।
কিন্তু ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে বিশেষ আইনটি বাতিল করে দিলে পুরো প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্প চালু হলে সাধারণ মানুষ শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের গুণগান গাইবে এমন আশঙ্কায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটি নিয়ে চরম অনীহা প্রদর্শন করে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের সমস্ত অবকাঠামো প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও শুধু রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগ করতে না পারা সরকারের চরম ব্যর্থতা। গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি মহেশখালী পাম্পিং স্টেশনে এনে সেখান থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পৌঁছানোর আধুনিক ব্যবস্থাটি পড়ে থাকায় দেশ যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। বর্তমান তেল সংকটে এই অবকাঠামোটি ব্যবহৃত হলে অর্থ ও সময়ের অপচয় রোধ করা সম্ভব হতো।
১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এই স্টেশনে ক্রুড অয়েলের তিনটি এবং ডিজেলের তিনটি মিলিয়ে মোট ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক রয়েছে। এই বিপুল মজুত ক্ষমতা অব্যবহৃত রেখে আট হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগকে বসিয়ে রাখা দেশের অর্থনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে এই প্রকল্প কেন দ্রুত চালু করা হয়নি, তা নিয়ে জনমনে এখন তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
