বিনা পারিশ্রমিকে দুই হাজারের বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করে দেশজুড়ে প্রখ্যাত হওয়া চিকিৎসক অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির ঘটনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর চাঁদাবাজ চক্রের প্রধান হিসেবে শেরেবাংলানগর থানা যুবদলের সাবেক নেতা মো. মঈন উদ্দিন মঈনের নাম আসায় প্রশাসনে তোলপাড় চলছে এবং বিব্রত অবস্থায় পড়েছে বিএনপির শীর্ষ মহল।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, মঈন কেবল ডা. কামরুলকেই অতিষ্ঠ করেননি, বরং গত দেড় বছর ধরে শেরেবাংলানগর এলাকায় গড়ে তুলেছেন এক বিশাল অপরাধ সাম্রাজ্য। যুবদল নেতার পরিচয় ব্যবহার করে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, সরকারি বাড়ি ও জমি দখলের মতো হেন কোনো অপরাধ নেই যা তিনি এবং তাঁর বাহিনী করেনি। এমনকি মসজিদ-মাদ্রাসার মতো পবিত্র প্রতিষ্ঠানও এই মঈন বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায়নি।
মঈনের এই অপরাধচক্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছে মাদক ও অস্ত্র কারবারি মাইনুদ্দিন এবং হত্যা মামলার আসামি রুবেল। স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দিয়ে এই চক্রটি পুরো এলাকায় গডফাদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মঈন নিজেকে শেরেবাংলানগর থানা যুবদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক দাবি করে ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করেন। শ্যামলীর মাদরাসাতুল কাউসার আল-ইসলামিয়া মাদ্রাসায় সবজি সরবরাহের চুক্তি নিয়ে হুমকি দেওয়া থেকে শুরু করে মাদ্রাসা ভবন সম্প্রসারণে বাধা দান এবং রড-সিমেন্ট কিনতে বাধ্য করার মতো অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
শুধু তাই নয়, জান্নাতুল ফেরদৌস মসজিদ ও সড়ক ও জনপথ স্টাফ কোয়ার্টার জামে মসজিদ কমিটি ভেঙে দিয়ে নিজের পছন্দের লোক বসিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকেও দলীয়করণের চেষ্টা করেছেন তিনি।
মঈনের অপরাধের জাল ছড়িয়ে আছে শ্যামলীর প্রধান সড়ক পর্যন্ত, যেখানে মাদক বিক্রির সুবিধার্থে আলতাফ নামের একজনকে হাত করে রাস্তার বৈদ্যুতিক বাতি দেড় বছর ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই অন্ধকার সুযোগে সন্ধ্যায় বসে মাদকের হাট এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ছিনতাই ও নারী উত্ত্যক্তের ঘটনা। এছাড়া সড়ক ও জনপথ কলোনির ৩০টি ঘর দখল, স্থানীয় গার্মেন্টস থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় এবং ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলা মঈন বাহিনীর নিত্যদিনের কাজ। গত ঈদে গরিব খাওয়ানোর নামে জোরপূর্বক চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এমনকি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সামনের অ্যাম্বুলেন্স মালিক এবং ফুটপাতের হকাররাও তাঁর চাঁদাবাজির হাত থেকে নিস্তার পায়নি।
শেরেবাংলানগর এলাকার অন্তত ১০-১৫টি আবাসিক হোটেলে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সরবরাহ এবং যৌন ব্যবসার নিয়ন্ত্রণও এই মঈন বাহিনীর হাতে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি দখলে বাধা দেওয়া, ভবন নির্মাণে অলিখিত শর্ত আরোপ এবং ডিস-ইন্টারনেট, গ্যাস সিলিন্ডার ও ময়লা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছেন তিনি।
অতি সম্প্রতি এক ব্যবসায়ীর জমি বিরোধ মীমাংসার নামে তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। ডা. কামরুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবির পর থেকে মঈন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। শেরেবাংলানগর থানার ওসি মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতিপূর্বে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না পেলেও এখন মঈনের অপরাধের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তাঁকে গ্রেপ্তারে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
