নাসরীন সুলতানা, সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার জীবনে দুই বার চিকেন পক্স হয়েছে এবং অসংখ্য বার হাম হয়েছে। অসংখ্য বার মানে আক্ষরিক অর্থে অসংখ্য বার।
ছোটবেলায় মাঝেমাঝেই হাম হতো। শেষের দিকে যখন র্যাশ শুকিয়ে আসতো, মা তেলাকুজের পাতা সরিষার তেলে ডলে সারা গায়ে মেখে রোদে বসিয়ে রাখতো। তারপর লাইফবয় সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে দিতো। বলে রাখা ভালো যে সেই সময়ে আমার মা সাবান মানে লাইফবয়, ক্রিম মানে তিব্বত স্নো, এবং পাওডার মানে মিল্লাত ঘামাচি পাওডার এগুলো তার ব্র্যান্ড ছিল। আর কাপড় কাচায় তিব্বত ৫৭০ এবং পরে হুইল।
আমার যখন জ্বর থাকতো, কিছু খেতে পারতাম না। আব্বা বাজার থেকে পাওরুটি এবং মিষ্টি কিনে আনতো। সাথে ডালিম, আপেল জাতীয় ফল থাকতো। কিন্তু কিছুই খেতে পারতাম না।
বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ঝিনাইদহ গিয়ে একবার হামে আক্রান্ত হলাম। সে যে কি কষ্ট! দুইদিন পর মাস্টার্সের ফাইনাল পরীক্ষা। সেই হাম নিয়ে একা বাসে উঠে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। ক্যাম্পাসে এসে শুনি আমার একটি কোর্সের পরীক্ষা সবার শেষে হওয়ার রুটিন ছিল, কিন্তু যেহেতু সেই কোর্সে ছাত্র আমরা দুইজন, আমার সাথে কোন রকম কথা না বলে আমার ব্যাচের ছাত্ররা অন্যজনের কন্সেন্ট নিয়ে পরীক্ষা সবার আগে নিয়ে এসেছে। তাতে করে তারা এপিয়ার্ড দিয়ে বিসিএস দিতে পারবে এবং আমি বাদে ক্লাসের বাকিরা পরীক্ষার জন্য সাতদিন বেশি সময় পাবে। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ায় এই রকম অন্যায় সিদ্ধান্তের বলি আমাকে পুরো পাঁচ বছর ভোগ করতে হয়েছে। যেহেতু ফার্স্ট ছিলাম, ক্লাসের বাকি ৩৫ জনই আমার কম্পিটিটর ছিল। কেউ মনেই করতো না যে আমারও প্রিপারেশন টাইমের অধিকার আছে।
যাইহোক, ক্যাস্পাসে এসে ডাক্তার দেখিয়ে এন্টিবায়োটিক খেয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠি। যদিও পরে জেনেছি হাম ভাইরাস জনিত রোগ বলে হাম সারানোতে এন্টিবায়োটিকের কোন ভূমিকা নেই।
এরপর হাম হলো প্র্যাগনেন্ট অবস্থায়। সেই বারের হাম আমার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণার হাম ছিল। হামের সাথে প্রচন্ড জ্বর, এবং শরীর ব্যাথা। আমি তখন মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার উপজেলা নির্বাচন অফিসার। একে তো প্রেগন্যান্ট বলে কিছু খেতে পারি না, তার উপর আব্বার মৃত্যু আমার জীবন ওলটপালট করে দিয়েছিল। কি যে দুঃসহ এক জীবন পার করেছি! এর মধ্যে হাম হওয়ায় শরীর নাড়াতে পারি না। প্রচন্ড ব্যথা। আমার মা একদিন ভর্ৎসনা করে বলল, “তুই এমন করিস ক্যান? এই রোগ যেন আর কারো হয় না!”
গাইনোকোলজিস্ট দেখানোর পর তিনি এন্টবায়োটিক দিলেন। বাচ্চার কোন ক্ষতি হচ্ছে কিনা তার জন্য আল্ট্রসনোগ্রাফি করালেন। আমি শুনেছিলাম প্রেগন্যান্ট অবস্থায় হাম হলে বাচ্চা বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ডাক্তার আমাকে আস্বস্ত করলেন কোন অসুবিধা হবে না। ইনফেকশন যাতে না হয় সেই জন্য এন্টিবায়োটিক দিয়েছেন।
আমার হাম সারার পর মা হামে আক্রান্ত হলো। এবার মা বুঝতে পারলো আমি কেন ব্যথায় কাঁতরাচ্ছিলাম। মাকে নিয়ে একটি কার ভাড়া করে মুন্সিগঞ্জে ফেরত আসলাম। কারণ তখন ঈদের ছুটি শেষ এবং আমার অফিস খুলে গেছে। মুন্সিগঞ্জে আসার পর মা’র জ্বর এত বেশি বাড়লো যে সারা রাত আমি নির্ঘুম মায়ের মাথার কাছে একটি চেয়ার নিয়ে বসে থাকতাম। একদিন তো সারা রাত মাথায় পানি ঢেলেছি। সেই সময়ে আমি আর মা যেন দুজন দুজনার হয়ে গেছি। পরিবারের অন্য কারো কোন সহযোগিতা পাইনি, না গর্ভজাত সন্তানের পিতার, না আমার সহোদরের। এক সময় আমরা দুইজনেই সুস্থ হয়ে উঠলাম। আমি অফিসের কাজে মন দিলাম, মা ঘর সংসার করতে থাকলো।
এর পরের বার হাম হলো কানাডাতে থাকাকালীন। আমি তখন ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টাতে মাস্টার্স করছি। একেবারে শেষ পর্যায়ে। কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। ২৪ মাসের কোর্স ২১ মাসে শেষ করে ফেলেঝি প্রায়। থিসিস সাবমিটের ডেট পড়েছে। কিন্তু আমার শখ হলো ব্যানফ ঘুরতে যাবো, লেক লুইস দেখবো। ইউনিভার্সিটি থেকে একটা টিম যাবে। ওদের সাথে রেজিষ্ট্রেশন করলাম। প্রথম ড্রাফট সাবমিট করে ল্যাপটপ এবং প্রয়োজনীয় কিছু বইপত্র সাথে নিয়ে ব্যাসফের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়লাম।
ক্যালগেরি হোটেলে গিয়ে ঘটলো এক বিপত্তি। পিজ্জা অর্ডার দিয়েছিলাম। ভুল করে পর্ক দেওয়া পিজ্জা আমার রুমে পৌঁছে দিয়েছিল। একবার দুইবার মুখে দিয়ে স্বাদে নোনতা লাগাতে কেন যেন সন্দেহ হয়েছিল। পরে ওদেরকে জানাতে ওরা “সরি”বলে ভেজিটেবল পিজ্জা রুমে দিয়ে যায়।
হোটেলে বসে ড্রাফটের যা যা এডিটিং ছিল সব শেষ করে ব্যানফ ঘুরে দুই দিন পরে বাসায় এসে দেখি কিছু খেতে পারি না। যা খাই সব বমি হয়ে যাচ্ছে। পরের দিন ফাইনাল সাবমিশন। কিন্তু সলিড খাবার পেটে পড়লেই বমি হচ্ছে। মনে করলাম পর্ক খাওয়ার কারণে মনে হয় মানসিক সমস্যা থেকে এটা হচ্ছে। সলিড খাবার বাদ দিয়ে কেবল রং চা এবং ব্ল্যাক কফি খেতে লাগলাম। ফেসবুকে দুই তিনটা ছবি আপলোড দিলাম রোগ ভুলে থাকার জন্য।
এক টানা ২৩ ঘন্টা শুধু চা কফি খেয়ে ফাইনাল ড্রাফট সাবমিট করার পর বাথরুমে গেছি ফ্রেস হতে, নিজেকে দেখে ভয় পেয়ে গেছি। আমার মুখ লাল হয়ে ফুলে গেছে। আবিস্কার করলাম সমস্ত শরীরে র্যাশ উঠেছে। তখন বুঝলাম গত দিন থেকে আমার আসলে জ্বর ছিল এবং পরের দিন আমার হাম হয়েছে। তবে জ্বর সম্ভবত আরো আগে এসেছে। কারণ হাম তিনদিন বা পাঁচদিনের জ্বরের পরে হয়। কোন হাম কেমন মারাত্মক সেটি বোধ হয় কতদিনের জ্বরে হলো সে হিসেবও গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু হাম হয়েছে ডিপার্টমেন্টে যাওয়া নিষেধ। সুপারভাইজার জিজ্ঞেস করলেন এক্সটেনশন লাগবে কিনা। আমি তখন মেয়ে দেশে রেখে গেছি। একটি দিন আমার কাছে বছরের মতো। কোন রকম এক্সটেনশন চাই না বলে ডিফেন্সের ডেট ঠিক হলো। পরের দিন ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার বললেন তিনি কোন ওষুধ দিবেন না। আমি তাঁকে যতই বোঝাই যে এর আগে যতবার আমার হাম হয়েছে আমাকে এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে এবং আমি দ্রুত সুস্থ হয়েছি। কিন্তু ডাক্তার বললেন, হাম হলে তাঁর কিছুই করার নেই। এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনের জন্য, আর হাম ভাইরাস জনিত রোগ। সুতরাং, তিনি কোনভাবেই এন্টিবায়োটিক দিতে পারবেন না। আমি কনভিন্সড হলাম তাঁর কথায়। যুক্তি অকাট্য।
তার কয়েকদিন পরে সেরে উঠলে ডিপার্টমেন্টে গেছি আমার সুপারভাইজার বড়জন হেসে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার কি সত্যি হাম হয়েছিল?” তখন আমি তো আকাশ থেকে পড়েছি। হায় আল্লাহ! শেষকালে সুপারভাইজার মনে করেছেন যে আমি থিসিস সাবমিটের এক্সটেনশন নেওয়ার জন্য হয়তো হামের গল্প দিয়েছি। আসলে হাম বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না তা কতটা ঘাতক হতে পারে। যার হাম হয় সে-ই বোঝে এর কতটা যন্ত্রণা। বাইরে থেকে দেখে সামান্য র্যাশ বা জ্বর মনে হতে পারে। তবে হামের অনেক সাইড ইফেক্ট আছে। আর এখন তো বোঝা যাচ্ছে শিশুদের জন্য হাম প্রাণঘাতী।
থিসিস ডিফেন্স হয়ে গেলে অবশ্য সুপারভাইজারকে বলেছিলাম যে আমি চুপিচুপি ব্যানফ ঘুরতে গিয়েছিলাম এবং সেখান থেকে হাম বাধিয়ে এসেছি।
ছোটছোট বাচ্চাদের হাম হয়েছে শুনে আমি যেন হামের যন্ত্রণা টের পাচ্ছি। গায়ের মধ্যে চিটচিট করে ফুটছে, চুলকাচ্ছে। আর আমাদের দেশে তো ভুলভালভাবে সব আমীষ, ভিটামিন সি না খাইয়ে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো দুর্বল করে দেওয়া হয়। ডাক্তারদের উচিত হাম হলে কী কী খাওয়া যাবে (আমার মতে এলার্জি জাতীয় খাবার না খাওয়া ভালো, তাতে চুলকানি কম হবে) সেগুলো নিয়ে ব্যাপক প্রচারনা চালানো, সচেতন করা। কী ধরনের স্বাস্থ্য সচেতনতা অবলস্বন করতে হব। সে বিষয়েও তাঁরা ভিডিও বানাতে পারেন।
লেখাটা বড় হয়ে গেল। আপনাদে পড়তে কষ্ট হবে হয়তো।
