পাকী বাহিনীর যুলুম-নির্যাতন ছিলো বর্ণনাতীত। ইতিহাসে তাদের নির্মমতার নজির মেলা ভার। পাকী সেনা ও এদেশীয় ঘাতদের নির্মমতার চিত্র ফুটে উঠে ৩০ মার্চের পৌরসভার সুইপার ইন্সপেক্টর ছাহেব আলীর অভিজ্ঞতা থেকে। ৩০ মার্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল থেকে সমস্ত লাশ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়। সুইপার ইন্সপেক্টর ছাহেব আলী রোকেয়া হলের চার তলার ছাদ থেকে উদ্ধার করে বিবস্ত্র যুবতীর ক্ষত-বিক্ষত লাশ। সেখানে দায়িত্বরত জনৈক পাকী সেনাকে জিজ্ঞেস করলে উত্তরে পাকী সেনাটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বললো, আমরা সকলে মিলে ওর সম্ভ্রমহরণ করতে করতে মেরেছি। এদিন বুড়িগঙ্গা নদী থেকে ট্রাক-ট্রাক লাশ তুলে স্বামীবাগে আনা হয়।
পাকিস্তানিরা বিভিন্ন কলাকৌশল গ্রহণ করে তখনও পূর্ব-পাকিস্তানের ব্যবসায়ী এবং পুঁজিপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিলো। এদিন রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রকাশিত পাকিস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, মার্চের প্রথম দিকে রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে স্টক এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে যে অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছিল তা দ্রুত কেটে যাচ্ছে এবং শেয়ার বাজারের অবস্থাও স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
সামরিক কর্তৃপক্ষের এক ঘোষণায় এদিন হাসপাতালের কর্মচারীদের অবিলম্বে কাজে যোগদানের নির্দেশ দেয়া হয়। আর এক সামরিক ঘোষণায় ৫ জনের অধিক ব্যক্তিকে একত্রে জমায়েতের উপর বিধি নিষেধ জারি করা হয়। পশ্চিম-পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় ভুট্টোর অভিমত প্রকাশিত হয়। ভুট্টো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ফ্যাসিস্ট ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে। ভুট্টো আরো বলে যে, পূর্ব-পাকিস্তানের পরিস্থতি সম্পূর্ণভাবে শেখ মুজিবের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলো। তিনি জনসাধারণকে ভুল পথে পরিচালিত করলেন এবং প্রকৃতই তিনি দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিলেন। ভুট্টো জানায়, পূর্ব-পাকিস্তানের পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে তা পাকিস্তানের নিজস্ব ও অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।
তখনও পূর্ব-পাকিস্তান রাইফেলস সেক্টর হেড কোয়ার্টার এবং রিজার্ভ পুলিশ লাইনে বাঙালি সৈনিকরা পাকী সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ তৈরি করে রেখেছে। কমান্ডো হামলার মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষতি স্বীকার করে পাকী সেনারা বেতার কেন্দ্র দখল করে। বেতার কেন্দ্র দখল করতে ঢাকা থেকে দুটো জেট বিমান নিয়ে গিয়ে আক্রমণ চালায়। কুষ্টিয়া শহরেও এদিন পাকী সেনারা বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করে।
(তথ্যসূত্র- উইটনেস টু সারেন্ডার; বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র; দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক পূর্বদেশ, ধর্মব্যবসায়ী ঘাতক জামাতীদের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম; মার্চ/এপ্রিল ’১৯৭১ ঈসায়ী)
[পত্রিকাঃ ৩১মার্চ ১৯৭১ তারিখে কলকাতা হতে প্রকাশিত যুগান্তর পত্রিকা হতে]
