নিজস্ব প্রতিনিধি
রাজধানীর বংশাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী তাইয়্যেবা। নতুন ক্লাসে উঠে সহপাঠীদের সঙ্গে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়ার কথা থাকলেও তার দিন কাটছে পুরোনো বিষণ্ণতায়। কারণ, ষষ্ঠ শ্রেণির ক্লাস টেস্ট আর অর্ধবার্ষিকীর প্রস্তুতির মাঝেই তাকে পড়তে হচ্ছে ফেলে আসা পঞ্চম শ্রেণির পড়া। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা তার।
কেবল তাইয়্যেবা নয়, দেশজুড়ে লাখো শিক্ষার্থীর অবস্থা এখন একই রকম। আইনি জটিলতা আর সরকারের নীতিগত পরিবর্তনের প্যাঁচে পড়ে ২০২৩ সালের ‘বাসি’ বৃত্তি পরীক্ষা এখন ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে নেওয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ অভিভাবক ও শিক্ষাবিদগণ। তারা একে ‘অগ্রহণযোগ্য শিশু নির্যাতন’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
অভিভাবকদের ভাষ্যমতে, শিক্ষার্থীরা গত ডিসেম্বরেই বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিল। কিন্তু তখন পরীক্ষা না হওয়ায় অনেকেই পুরোনো বই-খাতা তুলে রেখেছিলেন। এখন বছরের চার মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর নতুন শিক্ষাক্রমের ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ার ধরনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময়ই পুরোনো কাঠামোর পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাইয়্যেবার মা শিল্পী আক্তার বলেন, মেয়েটার ওপর আসলে চাপ পড়ছে। একদিক ষষ্ঠ শ্রেণির পড়া, তার ওপর বৃত্তি পরীক্ষার পড়া। দুটো চালাতে ওর সঙ্গে আমিও নাজেহাল।
রাইসা নামের আরেক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, ক্লাস সিক্সে উঠে ক্লাস ফাইভের পরীক্ষা দেওয়া অযৌক্তিক। বার্ষিক পরীক্ষার নম্বরের ভিত্তিতেও তো বৃত্তি দেওয়া যেত।
উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ করে সমাপনী পরীক্ষার ভিত্তিতে বৃত্তি চালু করেছিল। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পুনরায় আলাদা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর সরকারি ও বেসরকারি (কিন্ডারগার্টেন) কোটা নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হলে পরীক্ষা ঝুলে যায়।
সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করে এপ্রিলে পরীক্ষা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের চাপের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ইটস নট ম্যান্ডেটরি। ইটস অপশনাল। যারা পারবে না তারা দেবে না। তবে অভিভাবকদের দাবি, প্রতিযোগিতার বাজারে মেধা প্রমাণের সুযোগ হাতছাড়া করতে না চেয়ে বাধ্য হয়েই শিশুদের ওপর এই চাপ প্রয়োগ করছেন তারা।
রাজধানীর সুরিটোলা বা কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থী এখন আর পরীক্ষায় বসতে চাইছে না। অনেকে বই বিক্রি করে দিয়েছে, আবার অনেকে দুই বছরের পড়া একসঙ্গে সামলাতে না পেরে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, এ ধরনের পরীক্ষা সার্বিকভাবে শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখে না। বরং এটি এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. আজম খান একে ‘অগ্রহণযোগ্য শিশু নির্যাতন’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বছরের এক চতুর্থাংশ শেষ, এখন গত বছরের পরীক্ষা তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না।
আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে দেশের ৬১ জেলায় শুরু হচ্ছে এই পরীক্ষা। তিন পার্বত্য জেলায় শুরু হবে ১৭ এপ্রিল। আড়াই ঘণ্টার এই পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ে অংশ নিতে হবে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া এই শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষাব্যবস্থার এই ‘অদ্ভুত’ মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত লাভ কার হবে তা জানা নেই। তবে তাইয়্যেবা বা রাইসাদের মতো হাজারো শিশুর শৈশব যে এখন ‘দুই শ্রেণির’ পাঠ্যবইয়ের নিচে চাপা পড়েছে, তা স্পষ্ট।
