নিজস্ব প্রতিনিধি
দেশের স্বাস্থ্য খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা অব্যবস্থাপনা আর সমন্বয়হীনতার চড়া মাশুল দিচ্ছে দেশের কোমলমতি শিশুরা। একদিকে সরকারি গুদামে পড়ে আছে দুই কোটি ডোজ জীবন রক্ষাকারী এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকা। অন্যদিকে জনবল আর লজিস্টিক সংকটের অজুহাতে সেই টিকা পৌঁছাচ্ছে না শিশুদের শরীরে। ফলশ্রুতিতে রাজধানীসহ দেশের ১২টি জেলায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে হাম। গত কয়েক সপ্তাহেই হাম ও চিকিৎসা সংকটে প্রাণ হারিয়েছে অর্ধশতাধিক শিশু।
গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি) গত মাসেই দুই কোটি টিকা পাঠালেও কেবল সিরিঞ্জ, জনবল এবং প্রশিক্ষণের অভাবে তা প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ভয়াবহ চিত্র। তিনি স্বীকার করেছেন, ফান্ড এবং লজিস্টিকসের অভাবে এই বিপুল পরিমাণ টিকা অলস পড়ে আছে। প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে শিশুদের জীবন মরণপণ, সেখানে সরকারের আগাম প্রস্তুতির এই দৈন্যদশা কেন?
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই স্থবির হয়ে পড়ে স্বাস্থ্য খাতের বড় বড় প্রোগ্রাম। ইউনূস সরকারের আমল থেকে দীর্ঘ নয় মাস ধরে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় এক বছরের কম বয়সী শিশুরা কোনো সুরক্ষাই পায়নি। অনেক শিশু তাদের নির্ধারিত দ্বিতীয় ডোজ নিতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময় টিকার সরবরাহ বন্ধ থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কর্মীদের আন্দোলনের কারণে টিকাদান কর্মসূচিতে যে বিশাল ছেদ পড়েছে, তারই চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বর্তমানের এই হামের প্রাদুর্ভাবে।
তথ্যমতে, ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহীসহ ১২টি জেলায় হামের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১১ দিনে ৩৩টি শিশুর মৃত্যু এবং রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ১৯ শিশুর মৃত্যু প্রশাসনের চরম ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, ভেন্টিলেটর ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে রাজশাহী মেডিকেলে শিশুদের প্রাণহানি ঘটেছে, যা সময়মতো জানতেও পারেননি তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. নিজাম উদ্দিন এবং আইইডিসিআর-এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন একমত যে, টিকাদান কর্মসূচিতে এই দীর্ঘ ছেদ এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ পদ শূন্য থাকা বর্তমান সংকটের মূল কারণ। টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ ডোজ নেওয়ার ফলে একটি বিশাল শিশু জনগোষ্ঠী এখন মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে। তারা একে নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত টিকা ব্যবহারের আশ্বাস দিলেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। লজিস্টিক সংকট কত দ্রুত কাটবে এবং প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুরা কবে নাগাদ টিকার আওতায় আসবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা এখনো দৃশ্যমান নয়।
সরকারি নথিতে মজুদ থাকা কোটি কোটি ডোজ টিকা এখন শিশুদের জন্য কোনো কাজে আসছে না। বরং তা কেবল নথির সংখ্যা হয়েই পড়ে আছে। এই অব্যবস্থাপনার দায় শেষ পর্যন্ত কার—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
