আজ ২৫শে মার্চ। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় শোকাতুর দিন। ১৯৭১ সালের এই রাতে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র ঢাকাবাসীর ওপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ইতিহাসের সবচাইতে বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তা।
আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকে। কিন্তু সেই রক্তস্রোত থেকেই জন্ম নিয়েছিল আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।
সাইমন ড্রিং-এর সেই শিহরণ জাগানো বর্ণনা, তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তা প্রতিটি বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা থেকে বের করে দিলেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লুকিয়ে ছিলেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। ৩১ মার্চ লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’এ প্রকাশিত তাঁর সেই ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে উঠে আসে গণহত্যার নারকীয় চিত্র।
তিনি লিখেছিলেন, “২৫ মার্চ মধ্যরাতের পর ঢাকা মহানগরী মুহুর্মুহু তোপধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে। টিক্কা খান বর্বর সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নির্মমভাবে গণবিদ্রোহ দমনে সচেষ্ট হয়।” পিলখানা, রাজারবাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে তারা। কেবল ইকবাল হলের প্রথম ধাক্কাতেই ২০০ ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছিল।
বিশ্ব ইতিহাসের দ্রুততম ও ভয়াবহতম গণহত্যা, ১৯৭১ সালের সেই ৯ মাসে যে গতিতে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৯৮১ সালের জাতিসংঘের এক রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে, “মানবেতিহাসের গণহত্যাগুলোর মধ্যে স্বল্পতম সময়ে সবচাইতে বেশি মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে।” পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২৬০ দিনে গড়ে প্রতিদিন ৬,০০০ থেকে ১২,০০০ মানুষ খুন করা হয়েছে। কম্বোডিয়ার গণহত্যার হারের চেয়েও এটি কয়েকগুণ বেশি। এমনকি ২০ মে চুকনগরেই মাত্র একদিনে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।
৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। রবার্ট পেইন তাঁর ‘Massacre, The Tragedy of Bangladesh’ গ্রন্থে কুখ্যাত ইয়াহিয়া খানের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন— “ওদের (বাঙালিদের) ৩০ লাখকে হত্যা করো, বাকিরা আমাদের হাতের তালু থেকেই খাবার খাবে।” এই সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের কারণেই ৯ মাসব্যাপী বর্বরতায় ৩ লক্ষাধিক নারীকে ধর্ষণ এবং অসংখ্য জনপদ ধ্বংস করেছিল পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের দোসররা। সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের মতে, কেবল ২৫শে মার্চ রাতেই এক লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও জেনোসাইড, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি সেই সময় ভারতের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যার অভিযোগ এনেছিলেন। ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ বাংলাদেশের এই হত্যাযজ্ঞকে বিংশ শতাব্দীর পাঁচটি ভয়াবহ গণহত্যার অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
২০০২ সালে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আর্কাইভ’ অবমুক্তকৃত দলিলেও বাংলাদেশের এই নারকীয় ঘটনাকে ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও ২৫শে মার্চের সেই বিভীষিকা আজও বাঙালির হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটায়। শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটিকে কলঙ্কিত করতে এখনো যারা পাকি-প্রেমে মত্ত হয়, তাদের জন্য এই ইতিহাস এক চরম ধিক্কার।
