নিজস্ব প্রতিনিধি
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) সচিব আলি লারিজানি ইসরায়েলি হামলায় তার ছেলেসহ নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে এসএনএসসি সচিবালয়
ইরানের আধা-স্বায়ত্তশাসিত তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, বুধবার এক বিবৃতিতে এসএনএসসি বলেছে, শহীদের পবিত্র আত্মা আল্লাহর নেককার বান্দা, শহীদ ডক্টর আলি লারিজানির পবিত্র আত্মাকে আলিঙ্গন করেছে। অবশেষে ইরানের মহিমা ও ইসলামি বিপ্লবের জন্য তার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, তিনি সত্যের ডাকে সাড়া দিয়ে স্বদেশের সেবায় সম্মানের সঙ্গে শাহাদাতের পূণ্যময় মর্যাদা লাভ করেছেন।
এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে লারিজানি রমজানের শহীদদের ইমাম বিশ্বাসীদের নেতা ইমাম আলি (আঃ), ইসলামি বিপ্লবের নেতা সৈয়দ আলি খামেনি, তার শিক্ষক আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহারী এবং তার শহীদ সঙ্গী সৈয়দ হাসান নাসরাল্লাহ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাসেম সোলেইমানির সঙ্গে মিলিত হয়েছেন বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দাবি করেছিলেন, রাতভর ইসরায়েলি হামলায় ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি ও দেশটির বাসিজ ইউনিটের কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি নিহত হয়েছেন।
পরে বুধবার ইরানের কর্তৃপক্ষ লারিজানির নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর দিন ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে লারিজানিই হলেন নিহত হওয়া সবচেয়ে ঊধ্র্বতন কর্মকর্তা।
এসএনএসসি জানিয়েছে, ছেলে মোর্তেজা, এসএনএসসির উপপ্রধান আলিরেজা বায়াত ও একদল ‘সাহসী’ রক্ষী সোমবার রাতে তেহরানে ইসরায়েলি হামলায় লারিজানির সঙ্গে নিহত হয়েছেন।
ইসরায়েলি বাহিনী সোমবার রাতে ইরানের রাজধানী তেহরান এবং শিরাজ ও তাব্রিজ শহরে একযোগে হামলা চালায়। এসব হামলায় তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টারগুলোকে নিশানা করার কথা জানিয়েছে।
আল জাজিরা লিখেছে, ইরানের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে সংযত ও বাস্তববাদী একজন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত আলি লারিজানি দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরানের সমর কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিলেন তিনি।
১৯৫৮ সালে ইরাকের নাজাফে জন্ম নেওয়া লারিজানি ইরানের আমোলের একটি বিত্তশালী পরিবারের সন্তান। প্রভাবশালী ওই পরিবারকে একসময় ‘ইরানের কেনেডি পরিবার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল টাইম ম্যাগাজিন।
সমসাময়িক অনেক নেতার তুলনায় লারিজানির শিক্ষাজীবন ছিল তুলনামূলকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। তিনি গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি নেন এবং পরে জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের দর্শন নিয়ে গবেষণা করে পাশ্চাত্য দর্শনে ডক্টরেট করেন।
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে যোগ দেন। পরে সরকারে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন; সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবেও কাজ করেন। এক সময় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির প্রধানও ছিলেন।
২০০৫ সালে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবের দায়িত্ব পান লারিজানি। পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের নেতৃত্বও দেন তিনি। তবে পরে সেই দায়িত্ব ছেড়ে দেন।
২০০৮ সালে লারিজানি এমপি হন এবং টানা তিন মেয়াদে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি অনুমোদনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
২০২৫ সালের অগাস্টে লারিজানি আবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের সচিবের পদে ফিরে আসেন এবং তার পর থেকে তেহরান প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিলেন।
