সম্প্রতি নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি জানিয়েছেন, এখন থেকে তিনি ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ’ এড়িয়ে চলবেন, ‘অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা’ থেকে দূরে থাকবেন এবং ‘গঠনমূলক আলোচনায়’ মনোযোগ দেবেন। তার এই স্বীকারোক্তি দেখে মনে হলো, বেশ কয়েক দিন আগে লিখে রাখা মির্জা আব্বাস ও তাকে নিয়ে আমার এই অভিজ্ঞতাটি এখন প্রকাশ করা যায়। যখন তিনি নিজেই অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তার বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন, তখন সত্যটা সামনে আসা জরুরি।
নির্বাচনের আগে আমরা প্রতিদিন নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারির মুখে মির্জা আব্বাসকে নিয়ে অজস্র ‘চারিত্রিক অভিযোগ’ শুনতাম। তার কথা বলার ভঙ্গি, এক্সপ্রেশন আর ব্রিফ-পরবর্তী কথোপকথন শুনে মনে হতো, নিশ্চয়ই কোনো একদিন তিনি অন্তত একটি হলেও প্রমাণ হাজির করবেন। কিন্তু সময় গড়িয়ে গেলেও কখনো সেটি তিনি পারেননি বা করেননি। বরং দেখে মনে হতো, শুধু নিজেকে লাইমলাইটে আনতে বা প্রতিপক্ষকে হেয় করতে তিনি এসব বলছেন।
স্মৃতি হাতড়ালে মনে পড়ে সেই উত্তপ্ত নির্বাচনী রাতের কথা। ভোট গণনা নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়া একটি কেন্দ্রে আমি প্রায় তিন ঘণ্টা ছিলাম। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা পাটওয়ারির বর্ণনার ঠিক উল্টো।
সেখানে গিয়ে দেখি, অন্ধকার মাঠে মির্জা আব্বাস একটি চেয়ারে বসে আছেন। তার কর্মীরা উত্তেজিত হলেও তিনি নিজে ছিলেন ভীষণ শান্ত। একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছেন আর মাঝেমধ্যে কাউকে ফোনে বলছিলেন তার সঙ্গে কী করা হচ্ছে। আমি সেখানে গিয়ে পাটওয়ারিকে খুঁজছিলাম, অথবা তার কোনো কর্মীকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও ওই কেন্দ্রে পাটওয়ারি আসেননি। এমনকি তার পক্ষে জামায়াতেরও কাউকে সেখানে দেখা যায়নি।
সেই রাতে ওই কেন্দ্রে মির্জা আব্বাসের ২৩টি ভোট বাতিল ঘোষণা করা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কাছে বিএনপির কর্মীরা জেরা করতে থাকেন। ওই কর্মকর্তাও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পাটওয়ারি বাইরে রটিয়ে দিলেন—সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নাকি ওই কেন্দ্রে ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখা হয়েছে!
আমি নিজে ওই কর্মকর্তার কাছে গিয়ে জানতে চেয়েছিলাম তিনি অবরুদ্ধ কি না। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, তিনি অবরুদ্ধ নন; বরং ভোটের হিসাব ঠিকমতো না দিয়ে তিনি যেতে চান না। অথচ মাঠের বাইরে বসে পাটওয়ারি তখন মিথ্যে তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত অনেক রাতে কমিশন থেকে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে সব শুনে ভোটগুলোকে বৈধ ঘোষণা করেন। কারণ, আরও কয়েকটি কেন্দ্রে একই ধরনের সিল পড়ায় কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়: অন্য মার্কায় স্পর্শ না করলে ধানের শিষের পাশে সিল পড়লেও তা বৈধ হবে।
নির্বাচন শেষ হয়েছে, কিন্তু পাটওয়ারি থামেননি। আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকার সুযোগে বিএনপি নেতাদের নিয়ে তিনি একের পর এক এমন সব অভিযোগ করতে থাকেন, যার প্রমাণ তার নিজের কাছেও নেই। তার ‘জ্বালাময়ী’ ঢংয়ের এসব বক্তব্য শুনতে হয়তো সাময়িক ভালো লাগে, কিন্তু এর অধিকাংশিই যে ভিত্তিহীন, তা ওই রাতের মাঠের চিত্রই বলে দেয়।
নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারি এখন যদি সত্যিই ‘ব্যক্তিগত আক্রমণ’ ও ‘অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা’ বন্ধ করে গঠনমূলক রাজনীতিতে ফেরেন, তবে সেটিই হবে তার রাজনৈতিক জীবনের জন্য ইতিবাচক।
