শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়—তিনি একটি ইতিহাস, একটি আন্দোলন, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে তার অবদান এতটাই গভীর যে, তাকে ছাড়া বাংলাদেশের ইতিহাস কল্পনা করাও অসম্ভব।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে তিনি ছিলেন অগ্রণী। বিশেষ করে ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালির স্বাধীনতার প্রেরণার উৎস। তার দৃঢ় নেতৃত্ব ও আপসহীন মনোভাবই বাঙালিকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে নেয়।
বঙ্গবন্ধুর জীবন ছিল সংগ্রাম আর ত্যাগে পরিপূর্ণ। তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের প্রায় ১৪ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন—যা তার আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি বহুবার গ্রেফতার হয়েছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছেন; তবুও কখনোই জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে আপস করেননি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের হাতে বন্দি থাকলেও তার দৃঢ়তা বাঙালির মনোবলকে অটুট রেখেছিল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন—এই আত্মত্যাগ তাকে জাতির ইতিহাসে এক চিরস্মরণীয় মহাপুরুষে পরিণত করেছে।
সেই মহান নেতা, স্বাধীনতার মহান স্হপতি, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ১৭ মার্চ। এই দিনটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়েছে। বর্তমানে এটি আগের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত না হলেও, প্রতিটি বাঙালির মনোজগতে ১৭ মার্চ একটি গভীরভাবে গেঁথে থাকা শিশু দিবস হিসেবেই বিদ্যমান। বঙ্গবন্ধুর শিশুপ্রেম ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে তার স্বপ্ন—এই দিনটিকে এখনও হৃদয়ের ভেতর জীবন্ত রাখে।
একটি নাম যখন একটি ইতিহাস হয়ে ওঠে, তখন তা আর কোনো ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না—তা লাখো-কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। বঙ্গবন্ধুও তেমনি একটি নাম, যিনি বাঙালির অস্তিত্বের সাথে মিশে আছেন।
তাই প্রশ্ন জাগে—কোন জাগতিক শক্তি পারে সেই চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধুকে, তার আদর্শকে বাংলার মাটি থেকে ভুলুণ্ঠিত করতে?
উত্তর একটাই—কোনো শক্তিই পারে না। কারণ তিনি কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন, তিনি বাঙালির চেতনা, আত্মপরিচয় এবং স্বাধীনতার প্রতীক।
বঙ্গবন্ধু কেবল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তার স্বপ্ন ছিল একটি শোষণমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা। আজও তার আদর্শ আমাদের পথ দেখায়। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি দেশপ্রেম, সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
বঙ্গবন্ধু শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে না থাকলেও, তার চিন্তা-চেতনা, আদর্শ, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, কারাভোগ এবং তার জন্মদিন ঘিরে জাতির আবেগ—সবকিছু মিলেই তিনি বাঙালির হৃদয়ে চিরঞ্জীব।বঙ্গবন্ধু শুধু ইতিহাসের অংশ নন, তিনি বাঙালির চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বঙ্গবন্ধু শুধু অতীত নয়- তিনি বর্তমান ও ভবিষ্যতেরও প্রেরনা।
একটি তর্জনী যখন মানচিত্র হয়ে ওঠে, তখনই জন্ম নেয় এক অবিনাশী নাম—বঙ্গবন্ধু। বুলেট থামাতে পারে দেহ, কিন্তু ভালোবাসায় বেঁচে থাকা মানুষকে নয়। মুজিব চিরঞ্জীব।
বিনম্র শ্রদ্ধায়—শুভ জন্মদিন, হে জাতির জনক।
লেখকঃ ড. মাসুদার রহমান, অধ্যাপক, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
