কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে আবারও ঈদের চাঁদ উঠছে। কিন্তু প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর কাছে ঈদ মানে এখনো কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে বন্দি জীবন। এক সময় জোর গলায় বলা হয়েছিল—“পরের ঈদ নিজ দেশে হবে।” সেই আশ্বাসে ভর করে আশায় বুক বেঁধেছিল রোহিঙ্গারা, বিশ্বাস করেছিল দেশের সাধারণ মানুষও। কিন্তু বাস্তবতা হলো—ঈদ এসেছে, বছর পেরিয়েছে, সরকার বদলেছে; তবু রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরানোর সেই প্রতিশ্রুতি আজও কাগজেই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখনো কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন শিবিরে বসবাস করছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সেই অভিযানের পর আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয় এবং জাতিসংঘ পর্যন্ত ‘জাতিগত নিধন’ (ethnic cleansing) অভিযোগ তোলে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধানের নানা প্রতিশ্রুতি সামনে আসে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কথা জোর দিয়ে বলেছিলেন। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈঠকেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য সাত দফা প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
সেই সময় শরণার্থী শিবির সফর করে এমন আশাবাদও প্রকাশ করা হয়েছিল—পরবর্তী ঈদ হয়তো রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশ মিয়ানমারেই উদযাপন করবে। এই বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তা রোহিঙ্গা শিবির থেকে শুরু করে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি করে।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই আশ্বাসের বাস্তব রূপ দেখা যায়নি। বরং সমালোচকদের মতে, এটি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক আশ্বাস, যা বাস্তব কূটনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে অনেকটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
দুই বছর ক্ষমতা, তবু বাস্তব অগ্রগতি নেই
ড. ইউনূস প্রায় দুই বছর দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই গঠিত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ঘটে এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে।
সমালোচকদের অভিযোগ—এই দীর্ঘ সময়েও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং যে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা অনেকের কাছে এখন অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা তৈরি করা একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই মনে হচ্ছে।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন রাজ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্ন অমীমাংসিত থাকায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে আছে। অতীতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কয়েকবার প্রত্যাবাসন শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত না হওয়ায় তা সফল হয়নি।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক আলোচনায় মিয়ানমার প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রথম ধাপে ফেরত নেওয়ার জন্য যাচাই করেছে বলে তথ্য এসেছে। তবে সেই প্রক্রিয়াও এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ফলে প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ কাটবে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরেই। কাঁটাতারের বেড়া, অস্থায়ী ঘর আর সীমিত জীবনের মধ্যেই উৎসব পালন করতে হবে লাখো মানুষকে।
এক সময় যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—“পরের ঈদ দেশে”—আজ তা অনেকের কাছেই যেন এক অসম্পূর্ণ গল্প হয়ে আছে।
রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তব হয়নি, আর সেই কারণেই প্রশ্ন উঠছে—এই আশ্বাস কি বাস্তব পরিকল্পনা ছিল, নাকি ছিল সময়ের রাজনীতিতে তৈরি করা এক বড় প্রত্যাশার গল্প?
