নিজস্ব প্রতিবেদক
পাঁচটি মামলায় হাই কোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার একদিনের মাথায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে নতুন একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। ফলে আদালত থেকে জামিন পেলেও তার কারামুক্তি হয়নি।
একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা খোকনের ক্ষেত্রেও।
এই দুই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের একটি ‘বিশেষ নির্দেশনা’ সম্বলিত চিঠি নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। চিঠিতে জামিনে মুক্তি পাওয়া নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের ‘অন্য মামলায় গ্রেপ্তার (শো-অ্যারেস্ট)’ দেখানোর নির্দেশনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
‘বিতর্কিত বিশেষ নির্দেশনা’
এমন ঘটনার মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ের একটি চিঠি ছড়িয়ে পড়ে। ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা জামিনে মুক্তির পর মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় হলে তাদের অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে হবে।
চিঠিতে দুটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ রয়েছে—
১. জামিনে মুক্তি পাওয়া নেতারা যদি মাঠ পর্যায়ে তৎপরতা প্রদর্শনে সক্ষম হন, তবে তাদের অন্য মামলায় গ্রেপ্তার (শো-অ্যারেস্ট) দেখাতে হবে।
২. যারা এ ধরনের ‘বৈশিষ্ট্যের’ অধিকারী নন, তাদের ক্ষেত্রে আপাতত পুনরায় গ্রেপ্তারের প্রয়োজন নেই।
এই নির্দেশনার সত্যতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তারা নিয়মিত তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গ্রেপ্তার দেখাচ্ছে।
আইভীর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে
শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ইন্টেরিয়র মিস্ত্রি সেলিম মণ্ডল হত্যা মামলায় আইভীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জে আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় একটি বহুতল ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ভবনটির তৃতীয় তলায় ডাচ-বাংলা ব্যাংকের শিমরাইল শাখায় ইন্টেরিয়র কাজ করার সময় তিন কর্মী অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। তিন দিন পর ভবনটি থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের একজন ২৯ বছর বয়সী সেলিম মণ্ডল; তার বাড়ি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চরজগন্নাথপুর গ্রামে। ঘটনার প্রায় ১০ মাস পর তার বাবা ওয়াজেদ আলী হত্যা মামলা করেন।
জানা গেছে, বিস্ফোরক আইনে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় আসামির তালিকায় আইভীর নাম না থাকলেও তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়ার দাবি করে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে। জেলার এক সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেন।
এর আগের দিন একই ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় হাই কোর্ট আইভীকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়। তবে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হওয়ায় তিনি মুক্তি পাননি।
আইভীর আইনজীবী আওলাদ হোসেন অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক কারণে ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, “বিষয়টি হয়রানি নয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলাগুলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে আদালতের মাধ্যমে গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।”
সাঁথিয়ায় একই চিত্র
ঢাকা আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তি মেলেনি সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল রানা খোকনের। সাত মাস কারাভোগের পর জামিননামা কাশিমপুর জেল গেটে পৌঁছালেও তাকে নতুন একটি মামলায় ‘শো-অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়।
তার আইনজীবীদের ভাষ্য, সব মামলায় জামিন পাওয়ার পর মুক্তির কথা থাকলেও জেল গেট থেকেই নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরিবারের দাবি, এটি তাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখার কৌশল।
আইন ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
আইভী ও সোহেল রানা খোকনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে—জামিন পাওয়ার পরপরই নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো কি নিয়মিত তদন্তের অংশ, নাকি এটি রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া পদক্ষেপ?
ফাঁস হওয়া চিঠিতে ‘ফ্যাসিস্ট সংগঠন’ ও ‘মাঠ পর্যায়ে তৎপরতা’কে মানদণ্ড হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সাঁথিয়া উপজেলা চেয়ারম্যানের পুনঃগ্রেপ্তার এবং আইভীর মুক্তি না পাওয়া—দুটি ঘটনাই এখন স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ও বিচারিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
জামিন-পরবর্তী গ্রেপ্তার সংস্কৃতি প্রশাসনিক প্রয়োজন নাকি রাজনৈতিক কৌশল—সে প্রশ্নের উত্তরই এখন জনমনে প্রধান হয়ে উঠেছে।
