ইনকিলাব মঞ্চের আলোচিত মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চলমান পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুঁড়ি ও পারিবারিক বিতর্কের মাঝে এবার নতুন মোড় নিয়েছে। ওসমান হাদীর আপন বড় ভাই শরীফ ওমর হাদীকে জড়িয়ে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসানের ‘হত্যাকাণ্ডে বড় ভাইয়ের সংশ্লিষ্টতা’ সংক্রান্ত বিস্ফোরক দাবির পর এবার প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন নিহতের বোন মাসুমা হাদী।
হাদী হত্যা মামলার বাদী হিসেবে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং ওমর হাদীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান ‘নোংরামি ও মিথ্যাচারের’ তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক আইডিতে একটি দীর্ঘ ও আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন মাসুমা হাদী। পোস্টে তিনি মামলার বাদী নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের রহস্যজনক ভূমিকা এবং তৎকালীন বাস্তব পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরেন।
মামলার বাদী নিয়ে মাসুমা হাদীর বিস্ফোরক প্রশ্ন
ফেসবুক পোস্টে মাসুমা হাদী লেখেন, “আমি আমার ভাইয়ের মামলার বাদী নিয়ে কিছুই বলতে চাচ্ছিলাম না। কারণ এর চেয়েও অনেক ভয়ংকর ষড়যন্ত্র চালিয়েছে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে। শুধু আমার ভাইয়ের সম্মানের দিকে তাকিয়ে আমি মুখ খুলিনি। কিন্তু দুই দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার ভাইয়ের মামলার বাদী হওয়া নিয়ে যে পরিমাণ নোংরামি হচ্ছে, বাধ্য হয়ে আজকে সম্পূর্ণ বিষয়টাই পরিষ্কার করলাম।”
ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হওয়ার দিনের ঘটনা বর্ণনা করে তিনি জানান, খবর শোনামাত্রই তিনি ঢাকা এসে সরাসরি এভারকেয়ার হাসপাতালে অবস্থান নেন এবং এক মুহূর্তের জন্যও ভাইয়ের কাছ থেকে দূরে যাননি। এমতাবস্থায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, “এখন আমার প্রশ্ন, প্রশাসনের লোক এভারকেয়ারে এসে জাবেরের কাছ থেকে সাইন (স্বাক্ষর) নিল কেন? আর আপন বোন হিসেবে আমি উপস্থিত থাকাকালীন জাবের কেন সাইন দেবে? এ নিয়ে আমি বহুবার প্রশ্ন করেছি। আমাকে তখন বোঝানো হয়েছিল যে, ওমরের (ওসমান হাদীর ভাই) কাছে নাকি পুলিশ গিয়েছিল, ওমর নাকি বলেছে এখন আমরা চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত, চিকিৎসা সম্পন্ন হলে এই বিষয়গুলো দেখা যাবে।”
মাসুমা হাদী স্পষ্ট করে বলেন, জাবের যদি তাঁদের এলাকার (নলছিটি) ছেলে না হতো, তবে কোনো প্রশ্ন থাকত না। কিন্তু ওসমান হাদীর ছায়াসঙ্গী হিসেবে থাকা প্রত্যেকেই জানতেন যে তাঁর ছোট আপু ভাইয়ের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত। সেই ছোট আপুর কাছে না এসে, কার অনুমতি নিয়ে জাবের মামলার বাদী হলো—তা পরিষ্কার করার দাবি জানান তিনি।
ভাই ওমর হাদীর পক্ষে সাফাই ও চিকিৎসার বিবরণ
বড় ভাই শরীফ ওমর হাদীকে ‘হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী’ বানানোর অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মাসুমা হাদী সেদিনের ভয়াবহ স্মৃতি চারণ করেন। তিনি বলেন, “ওসমান গণির (ওসমান হাদী) রক্তে ওমর ফারুক রক্তাক্ত ছিল। কারণ একই রিকশায় দুই ভাই ছিল। বুলেট যদি আর একটা বের হতো, ওমর হাদীও ওখানেই আমার ওসমান গণির মতো লাশ হয়ে যেত। ওমরের গায়ে, পোশাকে এমনকি ওর হাতের ঘড়িটিতেও ওসমান গণির রক্তের দাগ লেগে ছিল। ওসমান গণিকে যেদিন সিঙ্গাপুর নেওয়া হবে, সেই দিন সকালে ওমর এভারকেয়ারে বসে প্রথম গোসল করে এবং ঘড়ির রক্তের দাগ পরিষ্কার করে।”
চিকিৎসার ব্যয়ভার নিয়ে চলা গুঞ্জন উধাও করে তিনি জানান, ওসমান হাদীকে দেশের বাইরে নেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম ওমর ফারুক ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নেন। সিঙ্গাপুর প্রথমে রিজেক্ট করে দিলে ওমর থাইল্যান্ডের হাসপাতালের সাথে যোগাযোগ করেন এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৫২ লাখ টাকা দিয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের টিকিট কেটে আনেন। ওমরের এই ব্যক্তিগত ও দ্রুত সিদ্ধান্তের কথা জানার পরই তৎকালীন সরকার তৎপর হয় এবং দ্বিতীয় দফায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় ওসমান হাদীকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।
মাসুমা হাদী ক্ষোভের সাথে লিখেন, “একজন বিপ্লবীকে সম্মান করতে হলে তার পরিবারকে নিয়ে কিভাবে এত মিথ্যাচার করা যায়? সম্মান করতে না-ই পারেন, কিন্তু কিছু না জেনে অসম্মান করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?”
মাসুমা হাদীর এই দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টের পর হাদী হত্যা মামলার মোড় সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে ঘুরে গেছে। একদিকে গণঅধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে ওমর হাদীর নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব জাবেরের বাদী হওয়া এবং পুলিশের তাড়াহুড়ো করে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়টিকে গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
