ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী সরকারের ধারাবাহিকতায় অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরানোর বদলে পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে রেখে গেছে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার এমনটাই বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল।
ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা, খেলাপি ঋণের রেকর্ড বৃদ্ধি, উচ্চ সুদের চাপে রুগ্ণ বেসরকারি খাত, বড় রাজস্ব ঘাটতি এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা মিলিয়ে অর্থনীতি এখন বহুমাত্রিক সংকটে।
১৮ মাসে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব ছেড়েছে এমন এক সময়ে, যখন নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে শুরুতেই মোকাবিলা করতে হচ্ছে অন্তত সাতটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
এগুলো হলো ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের পাহাড়, ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, প্রায় ২১ লাখ মানুষের কর্মহীনতা, তলানিতে নামা রাজস্ব আয়, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং ইতিহাসের সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের রেখে যাওয়া ‘উত্তরাধিকার নোট’-এও অর্থনীতির দুরবস্থার কথা স্বীকার করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিম্ন কর আদায়, উচ্চ খেলাপি ঋণ, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থা অর্থনীতির গভীরে প্রোথিত।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চাপে প্রবৃদ্ধি কমছে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পাচ্ছে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যার সুদ পরিশোধে অর্থনীতি চাপে পড়ছে।
বর্তমানে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ ১৬ লাখ কোটি টাকার বেশি এবং বৈদেশিক ঋণ সাত লাখ কোটি টাকারও বেশি। শুধু চলতি অর্থবছরেই ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের বড় অংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১৬ শতাংশ। মূলধন ঘাটতি ও আস্থাহীনতায় ব্যাংকিং খাত অস্থির। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হারে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে; নভেম্বরে বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় ৬.৫৮ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭৭ শতাংশে। মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় প্রকৃত আয় কমছে। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে পড়েছে।
কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। এসডিজি বাস্তবায়নে সিটিজেন প্ল্যাটফর্মের জরিপ বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
রাজস্ব আহরণেও বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত নেমে এসেছে ৬.৮ শতাংশে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৮ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে।
বেসরকারি বিনিয়োগ গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাননি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে প্রায় ৬ শতাংশে।
রিজার্ভ কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা টেকসই হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ৩৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার, তবে আমদানি বাড়লে এই রিজার্ভেও চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২১ শতাংশ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের চাপ। বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার থেকে এক লাখ আট হাজার কোটি টাকার ব্যয় বাড়তে পারে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সরকারকে একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, অন্যদিকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার কঠিন সমীকরণ মেলাতে হবে।
পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজের মতে, বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন ও জ্বালানি সংকট নিরসন জরুরি। উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও উৎপাদনমুখী খাতে প্রণোদনা প্রয়োজন।
এআইইউবির সহযোগী অধ্যাপক ড. হুমায়রা ফেরদৌস বলেন, উচ্চ সুদের কারণে পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে না, বহু কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বেড়েছে। কর্মসংস্থান বাড়াতে ব্যবসায়ীদের সহায়তা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোই এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ঋণ, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের ভার নিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রায় সাহসী ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন হবে বলে মত বিশ্লেষকদের।
