সাইফ সোহেল
ইশতেহার আসলে শুধু কিছু প্রতিশ্রুতির তালিকা না, এটা ভোটার আর রাজনৈতিক দলের মধ্যে এক ধরনের লিখিত চুক্তি। দল এখানেই বলে দেয়, ক্ষমতায় গেলে কী ধরনের রাষ্ট্র গড়তে চায়, কোন মূল্যবোধে রাজনীতি চালাবে, আর সাধারণ মানুষের জীবনে কী বদল আনবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি আর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে ইশতেহার প্রকাশ করেছে, কাগজে-কলমে সেগুলো বেশ আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এগুলোর ওপর ভরসা করা যাবে কি না, সেটা বুঝতে গেলে আমাদের পেছনের ১৫ বছরটাও দেখতে হয়—যখন আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় ছিল, অনেক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কঠিন প্রশ্নও রেখে গেছে।
প্রতিশ্রুতিতে ভরা ইশতেহার, কিন্তু রূপরেখা ঝাপসা
বিএনপি আর জামায়াত, দুই দলই তাদের ইশতেহারে বড় বড় কথা বলেছে—সংস্কার, জবাবদিহি, নিরপেক্ষ প্রশাসন, যুবকের চাকরি, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতির রূপান্তর—সবই আছে। তরুণ, নারী আর মধ্যবিত্ত–পেশাজীবী শ্রেণির জন্য এসব কথা স্বাভাবিকভাবেই আকর্ষণীয়, কারণ এখনকার সংকটগুলো সরাসরি তাদের গায়ে এসে লাগে; অস্বচ্ছ নির্বাচন, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার খরচ, অনিশ্চিত চাকরি, ব্যাংকিং সিস্টেমের ঝুঁকি, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবিশ্বাস—সব মিলিয়ে একটা চাপা ক্লান্তি কাজ করছে।
বিএনপির ইশতেহারকে পড়লে মনে হয়, এটা যেন একটা বড় সামাজিক-অর্থনৈতিক নকশা। পরিবার সহায়তা কার্ড, কৃষক সহায়তা কার্ড, স্বাস্থ্যখাতে মানবসম্পদ বাড়ানো, বেকার তরুণদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি, বড় আকারের পরিবেশ পুনরুদ্ধার—এসবের সঙ্গে আছে শাসনব্যবস্থা সংস্কার, প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করা, সংবিধান সংশোধন, উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ইত্যাদি। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, দমনমূলক আইন বাতিল, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান—এই সব প্রতিশ্রুতিও অন্তত কাগজে বেশ শক্ত বক্তব্য।
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। এত কিছু করার কথা বলা হলেও—কোনটা আগে হবে, কোনটা পরে, কত সময়ের মধ্যে কী ফল পেলে বোঝা যাবে যে কাজ এগোচ্ছে—এটা পরিষ্কার না। রাজস্ব কোথা থেকে আসবে, কোন খাতে ব্যয় কমানো হবে, ঋণনির্ভরতার ঝুঁকি কীভাবে সামলাবে—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর নেই। ইশতেহার বলে, “আমরা এটা–ওটা করব”, কিন্তু “কীভাবে করব, বাস্তবে কী কী বদল আনব”—ওই জায়গাটা ফাঁকা থেকে গেছে।
জামায়াত এক ধাপ ভিন্নভাবে কথা বলেছে। তাদের ইশতেহারের ভাষা অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক—“নিরাপদ, মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র” গড়ার কথা বলে। সংসদীয় ভারসাম্য, আইনের শাসন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, বৈষম্য কমানো, সংসদের তদারকি জোরদার, বিরোধী দলের ভূমিকা শক্ত করা—এই সব বিষয়ে তারা বিস্তারিত আলোচনা করেছে। এ দিক থেকে জামায়াত এক ধরনের “কাঠামোগত রাজনীতি”র কথা বলছে, যা সাধারণত ইশতেহারে এত খোলাখুলি আসে না।
তবু শেষ পর্যন্ত এসে জামায়াতও একই জায়গায় আটকে যায়। তারা যে উচ্চ প্রবৃদ্ধি আর আয় বৃদ্ধির স্বপ্ন দেখাচ্ছে, সেটা অর্জনের নীতিমালা, ধাপভিত্তিক পরিকল্পনা আর অর্থ জোগাড়ের পথ খুব পরিষ্কার না। বিদ্যমান আইন–প্রশাসনের ভেতর থেকে ঠিক কোন নতুন আইনে, কোন নতুন নকশায় তারা এই সংস্কার বাস্তবায়ন করবে—তারও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। ফলে ইশতেহারটা অনেকটা “অনেক ভালো ইচ্ছার তালিকা”, কিন্তু কাজ চালানোর মত সূচি ও মানচিত্র ছাড়া।
আরেকটা স্পর্শকাতর জায়গা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্ন। ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ আর অস্বস্তি আছে। তারা এখন বলছে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক ন্যায়বিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করবে, শিক্ষার্থীদের কাছে “সঠিক ইতিহাস” পৌঁছে দেবে। কিন্তু এই “সঠিক ইতিহাস”–এর ভেতর তাদের নিজেদের ভূমিকা কীভাবে উপস্থাপিত হবে, আদৌ কতটা নিরপেক্ষভাবে বলা হবে—এটা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে সন্দেহ থাকছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়—বিএনপি মূলত কল্যাণমূলক বণ্টন আর শাসনব্যবস্থা সংস্কারের কথা বেশি বলছে; জামায়াত বেশি কথা বলছে সংসদীয় কাঠামো আর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে। কারও ইশতেহারই একেবারে শুন্য না, বরং উল্টো; দু’জনেরই কথা অনেক। কিন্তু জবাবদিহি নিশ্চিত করার বাস্তব হাতিয়ার—যেমন বাধ্যতামূলক সম্পদ প্রকাশ, স্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়নের ডাটাবেজ, স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা—এসব জায়গায় দু’ দলই খুব বেশি এগোয়নি।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছর: দ্রুত উন্নয়ন, কিন্তু অসম্পূর্ণ কাঠামো
এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবসম্মত, সেটা বোঝার জন্য আমাদের ফিরতে হয় পেছনের ১৫ বছরে—যখন আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় ছিল। এই সময়টা একদিকে বড় বড় অর্জনের, অন্যদিকে কিছু অনড় সমস্যারও।
অর্থনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ সত্যিই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছে, তৈরি পোশাক আর প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে অর্থনীতি অনেক বড় হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর উন্নয়ন—এরকম প্রকল্পগুলো বাস্তবে মানুষের চোখে দেখা যায়, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের কাতারে উঠেছে, এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতিও এগিয়েছে। উন্নয়ন–বয়ান শুধু প্রচারপত্রে না, বাস্তবেও অনেকে তা অনুভব করেছে।
কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটা ছবি আছে। শহরে–গ্রামে বৈষম্য বেড়েছে, মধ্যবিত্তের জন্য জীবনযাত্রার খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়েছে, নিরাপদ আর সম্মানজনক চাকরি পাওয়ার সুযোগ অনেকের কাছে সংকুচিত মনে হয়েছে। অনেক বড় প্রকল্পে লোন বা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, কয়েকটি প্রকল্পের ব্যয় আর স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ব্যাংকিং খাত। কে কত বড় ঋণ নিয়ে ফেরত না দিয়েও প্রভাব বজায় রাখছে, কোন ব্যাংক কীভাবে খেলাপি ঋণে ডুবে যাচ্ছে, আর নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব দেখে কী করছে—এই প্রশ্নগুলো বারবার সামনে এসেছে। ফলে সরকার উন্নয়ন দেখাতে পারলেও, সেই উন্নয়নের ভেতরের আর্থিক ঝুঁকি আর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।
রাজনীতির দিক থেকে আওয়ামী লীগ একটা শক্তিশালী, স্থিতিশীল সরকার দিতে পেরেছে—এ কথা অস্বীকার করা কঠিন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার পরের তিনটি নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক, বিরোধী দলের ওপর চাপ, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা, মানবাধিকার নিয়ে অভিযোগ—এসবও একই সময়ের বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক অনেক রিপোর্টে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে “সঙ্কুচিত” বা “আংশিক স্বাধীন” বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
সরকারের ব্যাখ্যা ছিল—উন্নয়ন আর স্থিতিশীলতার স্বার্থেই কিছু কঠোরতা দরকার ছিল, বিশেষ করে উগ্রবাদ আর সহিংস রাজনীতির অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে। বাস্তবে আমরা পেয়েছি এক ধরনের “ডেভেলপমেন্টাল স্টেট”—যেখানে উন্নয়ন দ্রুত হয়েছে, কিন্তু সেই উন্নয়নের ওপর নজরদারি আর জবাবদিহির কাঠামো সব সময় সমান শক্ত ছিল না।
এই মিশ্র অভিজ্ঞতাই এখন নতুন ইশতেহারগুলো বুঝতে সাহায্য করে। আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে, একটি দল চাইলে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে, অর্থনীতিকে সামনে টেনে নিতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে সে–ও দেখিয়েছে, যদি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা আর প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা শক্ত না হয়, তাহলে উন্নয়ন যতই হোক—অবশেষে সেটা অবিশ্বাস আর অস্থিরতার ভেতরেই আটকে যায়।
পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য আর নিজের ক্ষমতার লাগাম টানা: যেখানে তিন পক্ষেরই ঘাটতি
আজকের পৃথিবীতে শুধু “ভালো কথা” বললেই ভোটার খুশি থাকে না। মানুষ জানতে চায়—প্রথম ১০০ দিনে কী করবেন, প্রথম বছরে কী করবেন, পাঁচ বছরে কী বদলাবেন—আর কিসের মাধ্যমে বুঝব যে এগোচ্ছেন? এই পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যের জায়গাটায় বিএনপি, জামায়াত—কেউই খুব শক্ত না। সব দলই বলে, “দুর্নীতি কমাব”, “নির্বাচনকে নিরপেক্ষ করব”, “প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করব”—কিন্তু কবে, কোন আইনে, কোন প্রতিষ্ঠানকে কত ক্ষমতা দিয়ে, কীভাবে—এসব প্রশ্নের জবাব খুবই সাধারণভাবে বলা থাকে, বিস্তারিতভাবে না।
আরেকটা জরুরি ব্যাপার হলো আত্মনিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতায় গিয়ে নিজের হাতেই লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি না থাকলে সংস্কারের কথা যতই বলা হোক, তা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে কী ধরনের সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়া হবে, সম্পদের বাধ্যতামূলক হিসাব–নিকাশ আর স্বচ্ছ রাজনৈতিক অর্থায়ন কখনো চালু করা হবে, বিচার বিভাগ আর দুর্নীতি দমন কমিশনের নিয়োগ পদ্ধতি কীভাবে দলীয় প্রভাবের বাইরে নেওয়া হবে—এসব জায়গায় স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছাড়া “গুড গভর্ন্যান্স”–এর কথা শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু ভরসা জাগে না।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, উন্নয়নমুখী একটি সরকারও যদি নিজের ক্ষমতার ওপর কঠিন আইনি লাগাম না টানে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলো তার হাতের যন্ত্র হয়ে যেতে বাধ্য। বিএনপি আর জামায়াত এখন প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার কথা বলছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে নিজের ওপরও প্রযোজ্য করার মতো কঠোর নীতিমালা তারা কতটা বাস্তবে মানবে—এই সংশয়টা থেকেই যায়।
শেষ কথা: ইশতেহার নয়, পরীক্ষার নাম বাস্তবতা
জুলাই–পরবর্তী অস্থিরতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার রিফর্ম, অর্থনৈতিক চাপ, ব্যাংকিং সংকট, বেকার তরুণদের হতাশা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সহজ না। এই অবস্থায় বিএনপি আর জামায়াতের ইশতেহারকে এক কথায় উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগও নেই, আবার অন্ধ আস্থায় বরণ করে নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ না।
প্রশ্নটা এখন খুব সরল কিন্তু কঠিন:
কোন দল এমন একটা কাঠামো দাঁড় করাতে রাজি, যেখানে ব্যয়–নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়নের পরিকল্পনা, শক্ত আইনগত সুরক্ষা, পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য আর নিজের ক্ষমতার ওপরও লাগাম টানার অঙ্গীকার থাকবে? অর্থাৎ, যে কাঠামো আওয়ামী লীগের উন্নয়ন–অভিজ্ঞতা থেকে শেখা—ভালোটা রেখে, দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করবে।
ইশতেহারের আসল পরীক্ষা শেষ হয় না ঘোষণার দিন; সেটা শুরু হয় ভোটের পরদিন সকাল থেকে। গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বলে, যে দলই পরের পথে হাঁটুক, যদি সে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, নির্ভরযোগ্য নির্বাচন আর স্বচ্ছ অর্থায়নের কাঠামো গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে আজকের সংকটের বৃত্ত ভাঙার বদলে আমরা কেবল নতুন মুখে পুরোনো অভ্যাসই দেখতে পাব। আর যে কেউ এই চক্রটা ভাঙতে পারবে, উন্নয়ন আর গণতন্ত্র—দুটোকেই একসঙ্গে টেকসই করার মতো সাহস দেখাতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বাসযোগ্যতা আসলে তারই প্রাপ্য হবে।
