জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে সঙ্গে নিয়ে ২০২৫ সালের ১৪ মার্চ (রমজান মাসে) কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দেন, “রোহিঙ্গারা আগামী ঈদে মায়ানমারে ফিরে উদযাপন করবেন।” এই ঘোষণা দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহলকে আশায় ভরিয়ে তুলেছিল। কিন্তু ১১ মাস পার হয়ে গেলেও প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি শূন্য। উল্টো দলে দলে নতুন রোহিঙ্গা ঢুকেছে—গত দু’বছরে ১ লাখ ৩৯ হাজার। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও নোয়াখালীর ভাসানচরের ৩৪টি শিবিরে এখন সর্বমোট ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫৪৯ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) অফিসের হিসাবে শিবিরে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ জন, বাকিরা সংলগ্ন এলাকায়।
ইউনূসের ঘোষণার পর কমপক্ষে ৫০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারে ঢুকেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। মায়ানমারের রাখাইন থেকে চলমান সংঘাতের কারণে এই অনুপ্রবেশ বেড়েছে। ফলে খাদ্য সহায়তা কমছে, স্বাস্থ্যসেবা সংকট তীব্রতর, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, সীমান্তে নজরদারি সত্ত্বেও মানবপাচার চক্র ও দালালদের তৎপরতায় অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন। স্থানীয় বাসিন্দারা বনভূমি উজাড়, পরিবেশদূষণ, জীবিকা সংকট ও সামাজিক টানাপোড়েনে ভুগছেন।
প্রত্যাবাসন চাপা পড়ে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়রা স্থায়ী বসবাস চান না, রোহিঙ্গারাও মায়ানমারে ফিরতে চায়। আরও বিতর্কিত, সৌদি আরবে ৪০-৫০ বছর বসবাসকারী ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যুর সিদ্ধান্ত। কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, “এটা আত্মঘাতী। স্থায়ী অবকাঠামো, নতুন অনুপ্রবেশ, পাসপোর্ট—এসব বুমেরাং হয়ে ফিরবে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান দায়ী। স্থানীয় মতামত না নিয়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ভুল।” রোহিঙ্গা নেতা সিরাজুল মোস্তফা বলেন, “পাকা ঘরের কথা শুনে হতাশ। ঈদের আশ্বাস কানে বাজে, কিন্তু ঘরে ফেরা দূরের।”
২০১৭-এর ঢলের পর সরকার ২০১৮-এ মায়ানমারে ৮ লাখ ২৯ হাজারের তালিকা দেয়। যাচাইয়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার ছাড়পত্র পায়, কিন্তু একজনও ফেরেনি। ২০১৮-১৯-এ জাতিসংঘের চেষ্টা ব্যর্থ হয় নাগরিকত্ব-নিরাপত্তা ইস্যুতে। মায়ানমারে সংঘাত অব্যাহত। কক্সবাজার জেলা বিএনপি সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, “জিয়া-খালেদা আমলে সমস্যা ছিল না। তারেক রহমান সমাধান করবেন।” রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “দেড় লাখ নতুন রোহিঙ্গায় সংকট জটিল, ফেরতের উত্তর অজানা।”
প্রবল জনস্ফীতিতে মানবিক সামাজিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত। শিবিরে খাদ্য-স্বাস্থ্য সংকট গভীর। বিশ্লেষকরা বলছেন, কূটনৈতিক চাপ না বাড়লে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। স্থানীয়রা প্রতিবাদী রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য নতুন নিরাপত্তা-অর্থনৈতিক হুমকি হয়ে উঠছে।
