ইরফান শেখ
সম্ভবত এটা আমার লেখা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পোস্ট। আমি ঝুঁকিটা নিচ্ছি।
আমাদের রাজনীতির বেশ কিছু হিসাব ঠিক মিলছে না।
আওয়ামী লীগের যদি কাউকে গুলি করতে ইচ্ছা করে, সে ইচ্ছা-তালিকায় সবার উপরে থাকবে নাহিদ, হাসনাত, সারজিস, সাদিক, আসিফ বা মাহফুজ। এরাই হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে। এদের মধ্যে তিনজন উপদেষ্টা ছিলেন। বাকিদের চাল-চলন ছিল সাধারণ মানুষের মতোই।
হাসনাত আব্দুল্লাহ পাঠাও বাইকে চড়ে যমুনায় যেতেন। কোনোদিন হেলমেট পরতেন না। হাসনাত, নাহিদ, সারজিসরা কোনো রকম সেফটি নেটের মধ্যে ছিলেন না। এদের যেকোনো কাউকে শুট করা মাঝারি লেভেলের দক্ষ কোনো শুটারের পক্ষে সহজ কাজ। কিন্তু লীগ এদের কাউকে না মেরে জুলাই আন্দোলনের থার্ড লেয়ারের আন্দোলনকারী ওসমান হাদিকে মারলো।
ক্রাউড ফান্ডিং করে, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কতটা কঠিন আমি জানি। আপনি ক্লাব, পাঠাগার, সমাজসেবী সংগঠন, পরিবেশবাদী সংগঠন করে থাকলে আপনিও জানেন কাজটা কত কঠিন। ওসমান হাদি দেড় বছরের মধ্যে সংগঠন দাঁড় করিয়ে ক্রাউড ফান্ডিং করে লাখ লাখ টাকার আসবাবপত্র, কার্পেট, ডেকোরেশন, বই-পত্র কিনে ফেললেন। ঢাকার ইকোনমিতে একটা নন-এনজিও সংগঠনের রাতারাতি এমন অ্যাসেট তৈরি হওয়া শুধু অস্বাভাবিক না, এটা অসম্ভব! অর্থাৎ, হাদির পেছনে বড় কারো আশীর্বাদ ছিল।
ওসমান হাদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, শ্রমিক নেতা, ছাত্র নেতা—কোনোটিই ছিলেন না। তার সারাক্ষণ মৃত্যুভয়ে ভীত থাকার কিছু ছিল না। বরং মৃত্যুভয় যদি পেতেই হয়, হাদির চেয়ে উপরে যাদের নাম বললাম তাদের মৃত্যুভয় বেশি থাকার কথা। কিন্তু আমরা জুলাই-এর প্রথম সারির যোদ্ধাদের সারাক্ষণ মৃত্যুভয় নিয়ে জপ করতে দেখি না।
কিন্তু হাদিকে দেখি সে ১৩-১৪টা ভিডিওতে, ইন্টারভিউতে, রেকর্ডে বলছে ‘আমাকে মেরে ফেললে’, ‘যদি আমি মারা যাই’, ‘মুখে হাসি নিয়ে মরে যাবো’ ইত্যাদি। কে বা কারা হাদির মাথায় বারবার মৃত্যুর ভয়, মৃত্যুর চিন্তা ঢুকিয়েছে? তাকে কি কেউ মেরে ফেলার জন্যই প্রস্তুত করছিল?
ক্রাউড ফান্ডিং-এর ক্ষেত্রে দেখা গেল অপরিচিত এক লোক এসে হাদির পকেটে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে চলে গেল। হাদি বললেন, এই লোককে সে চিনেও না। ওই লোক অন্য ভিডিওতে বললো—সে হাদিকে চেনে, হাদি তাকে চেনে। হাদিকে এর আগেও সে টাকা দিয়েছে।
দুজনের কথা মিললো না। এদের একজন অবশ্যই মিথ্যাবাদী। যদি লোকটা মিথ্যাবাদী হয় তাহলে তাকে রিমান্ডে নিয়ে বের করা দরকার, হাদির মৃত্যুর আগে কী উদ্দেশ্যে সে এই মিথ্যা বলছে? ৫০ হাজার দেওয়ার উদ্দেশ্য কী?
শুরু থেকে ওসমান হাদি কোনো ন্যাশনাল ফিগার ছিলেন না। একটা নির্দিষ্ট গন্ডির মানুষ উনার অডিয়েন্স ছিলেন। এই অডিয়েন্স পাওয়ার মূলে হাদির ফিচারগুলো হলো—ঢালাও ভারতবিরোধী রেটোরিক, ন্যায়কে ইনসাফ বলা, নির্যাতনকে জুলুম বলা, অন্যান্য সব সঙ্গীত নিরুৎসাহিত করে কেবল কাওয়ালি গাওয়া হালাল করা ধরণের কালচারাল পপুলিজম, কাজী নজরুলের শ্যামা সঙ্গীত মাটি চাপা দিয়ে তাকে ইসলামের কবি হিসেবে দেখানো ইত্যাদি। এই প্রোডাক্টগুলো যাদের পছন্দ—হাদি শুধু তাদের মধ্যে পরিচিত ছিল। জুলাই আন্দোলনেও হাদি বড় কোনো ভূমিকায় ছিল না।
হাদি ও ইনকিলাব মঞ্চ শুরু থেকে যেসব বক্তব্য দিচ্ছিলো তা ক্লোজলি জামায়াতের সাথে অ্যালাইন করে। জামায়াত যে বক্তব্য, যে কর্মসূচী নিজেরা দিতে পারতো না—সেটা শিবিরকে দিয়ে করাতো। যেটা শিবির করতো না, সেটা ইনকিলাব মঞ্চকে দিয়ে করাতো। আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধের দাবির সময় ইনকিলাব মঞ্চ জামায়াতের সহযোগী হিসেবে মূল নেতৃত্ব দেয়, সড়কে অবস্থান নেয়। অবস্থান নিতে অবশ্যই টাকা লাগে।
এটা ৪ঠা আগস্ট না যে স্কুল, অফিস সব বন্ধ, আর আপনি ফ্রি টাইমে আন্দোলন করলেন। গণজাগরণ মঞ্চের মতোই ইনকিলাব মঞ্চ চালাতে টাকার দরকার ছিল। কেউ সাধারণ ছাত্র হয়ে অফিস, ব্যবসা, ক্লাস বাদ দিয়ে লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে রাস্তায় রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকবে না। এসব কাজে ফান্ডিং ইনকিলাব মঞ্চ কোথায় পেয়েছে আমরা জানি না। ফান্ডিং জামায়াত থেকে এসেছে না অন্য কোনোভাবে এসেছে—সেসব ক্লিয়ার না।
ডাকসু নির্বাচনের সময় ছাত্র শিবির হাদির ইনকিলাব মঞ্চের সাথে কোলাবরেশন করলো। খেয়াল করুন। জামাত তাদের মিত্র এনসিপির সাথেও কোলাব করেনি। একটা অরাজনৈতিক, ছোট্ট প্ল্যাটফর্মের সাথে অলিখিত কোয়ালিশন করে প্যানেল করা হলো। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদকের পদ ইনকিলাব মঞ্চের জুমাকে দেওয়া হলো। কেন একটা ভোটবিহীন অল্প জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের জন্য শিবির একটা সিট স্যাক্রিফাইস করলো—এটা পরিষ্কার না। শিবিরের সাথে ইনকিলাব মঞ্চের স্বার্থ কোন জায়গায়?
হাদি প্রথমবারের মতো ন্যাশনাল লাইমলাইটে আসেন যখন সে গোপালগঞ্জ ঘটনায় প্রকাশ্যে বলেন “এদের শাউয়া মাউয়া ছিড়ড়া ফালাতে হবে”। তার আগে সাধারণ মানুষ তাকে চেনে না। ক্যামেরার সামনে এমন কথা বলতো কেবল সাকা চৌধুরী আর মানুষ এটা লুফে নিতো। হাদির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হয়নি। সে রাতারাতি ন্যাশনাল ফিগারে পরিণত হন।
এরপর হাদি বেশ কয়েক মাস প্রাসঙ্গিক থাকেন। কাজের মাধ্যম দিয়ে না। তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করেন না। কিন্তু তাকে নিয়ে রিলস, ভিডিও, প্ল্যান করে করা পডকাস্ট, মিম ইত্যাদি বাড়ে। জামাতের বিভিন্ন নিরপেক্ষ পেজ ও মিম গ্রুপগুলো হাদিকে সিগমা মেল বানানোর প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু করে। নিউ মিডিয়াগুলো হাদিকে বারবার সারফেস করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভারতের বিরুদ্ধে ফাঁকা বুলি, পপুলিজম চর্চা ছাড়া অন্য কোনো ইমপ্যাক্টফুল কাজ না করায় মূলধারার মিডিয়াতে হাদির জায়গা হয় না। নির্বাচনের যখন কোনো আমেজও নেই, তখন হাদি ঢাকা-৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রচারণা শুরু করেন। অথচ এমনটা করার কথা না। আর কেউ করেনি। এসব কাজ র্যাশনাল আচরণ মনে হয় না।
আচমকা ১২ই ডিসেম্বর শুক্রবারের দিনে, সারা বাংলাদেশ যখন নামাজ পড়ে ফেসবুক স্ক্রল করার পিক আওয়ারে ব্যস্ত তখন ওসমান হাদি মারা যান। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে খুনটা ছাত্রলীগের কর্মী ফয়সালের করা। কিন্তু ফয়সালকে হায়ার করে কে? তার বাসায় বেশ কিছু চেক পাওয়া যায়। যেগুলোর মোট মূল্য ২১৮ কোটি টাকা। জুলাই আন্দোলনের থার্ড লেয়ারের একজন কর্মীকে, ইনকিলাব মঞ্চের প্রধানকে মারতে কেউ একজন ২১৮ কোটি টাকা দিয়েছে!!! (৩টা আশ্চর্যবোধক টু বি নোটেড)
২১৮ কোটি টাকার সত্যকান্ড কাঁচা হাতে হওয়ার কথা না। ছোট সাইজের একটা দেশের সরকারপ্রধানকে মারতেও কেউ এতো টাকার চেক লেখে না। এসব চেক ভাঙানোও হয়নি। ফয়সালের বাবা, মা, স্ত্রী, প্রেমিকা, পরিবার সব ধ্বংস হয়েছে। ফয়সাল ২১৮ কোটি টাকা থেকে একটা টাকাও নিতে পারেনি। আর ২১৮ কোটি টাকার কাজ এতো কাঁচা হওয়ার কথা না। তুরস্ক থেকে আন্তর্জাতিক মানের শুটার ভাড়া করে আনার কথা।
ফয়সাল, ২১৮ কোটি, ফয়সালের পরিবারের ধরা পড়া—এগুলো মিলছে না। সরকারও প্রকাশ করছে না এই ২১৮ কোটি টাকা কার চেকবুক থেকে ইস্যু হয়েছে। একাত্তর টিভি এবং আরও দুজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক একটা করে চেক হাতে পেয়েছেন কিন্তু তারা চেকগুলো প্রকাশ করছেন না, অথবা করতে পারছেন না। এই বিষয়গুলো খুবই ফিশি। হাদিকে মেরে ফয়সালের লস হয়েছে, লস হয়েছে আওয়ামী লীগের, তাদের অল্প যে কয়টা সমর্থন ছিল তাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর হাদির ইন্তেকালের সবচেয়ে বড় বেনিফিশিয়ারি হয়েছে জামায়াত।
বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি গোল্ডফিশের মতো। তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ অতীত, জুলাই অতীত, সাগর-রুনী, আবু সাঈদ, খালেদা জিয়া, তনু, কল্পনা চাকমা, ইলিয়াস আলী—সব অতীত। নতুন ইস্যু আসলেই মানুষ পুরনো সত্যকান্ড ভুলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে প্রথম এক ব্যক্তি হাদি—যাকে টানা আড়াই মাস ধরে প্রাসঙ্গিক রাখা হয়েছে। গত আড়াই মাসে এমন একটা সিঙ্গেল দিন যায়নি যেদিন না অন্তত ১০০টা নিরপেক্ষ মিম-পেজ হাদিকে নিয়ে পোস্ট করতে ভুলে গেছে।
মাঝখান দিয়ে খালেদা জিয়া মারা গেছেন, ইরানে ৫ হাজার লোক মরে গেছে, নিউ ইয়ার এসেছে, নির্বাচন চলে এসেছে, পে স্কেল বাতিল হয়েছে, তারেক রহমান এসেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা বাতিল করেছে কিন্তু হাদির ইস্যু চাপা পড়েনি। আমি বলছি না যে পড়া উচিত। কিন্তু এটা বাংলাদেশের ইতিহাসের প্যাটার্নের সাথে মিলে না।
অথচ হাদির জীবনবৃত্তান্ত ঘাঁটলে আপনি উল্লেখ করার মতো কাজ পাবেন না। সে সাদিক কায়েমের মতো আল জাজিরার প্রধান মাধ্যম ছিল না, তাকে ডিবি তুলে নিয়ে যায়নি, সে উপদেষ্টা ছিল না, সে হান্নান মাসউদের মতো স্থানীয় রাজনীতির কোর ফিগার হয়নি, সে ভিপি নূরের মতো মার খেতে খেতে নেতা হয়ে উঠেনি। তার পুরো উত্থানটা একটা তাসের ঘরের মতো। অথচ সেই ঘর বাতাসে নড়ে না। ঘর যেন সুপারগ্লু দিয়ে দাঁড় করানো। হাদি এই সুপারগ্লু কোথায় পেলেন?
হাদির কৃতকর্ম কী? কেন হাদি গুরুত্বপূর্ণ তা আপনি পাবেন প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে। হাদির জানাজার দিন প্রধান উপদেষ্টা ৩ মিনিটের বক্তৃতা দিলেন। তাতে ৪-৫ বার সেইম কথা রিপিট করলেন। বললেন যে—হাদি আমাদের মন্ত্র দিয়ে গেছে চির উন্নত মম শির। আমাদের শির উঁচু করে রাখতে হবে। আমরা শির নিচু করবো না। এই কথাই ঘুরে ফিরে বারবার। কারণ প্রধান উপদেষ্টা সহানুভূতিশীল হওয়ার পরেও উল্লেখ করার মতো হাদির কোনো অবদান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আর চির উন্নত মম শিরের যে মন্ত্র, তাও হাদির না, নজরুলের।
এই শূন্য থেকে গজিয়ে ওঠা সত্যের শিকার, ভিক্টিম মানুষটার মৃত্যুর পর শিবিরের দুই ছাত্রনেতার আহবানে পরিকল্পিতভাবে দেশের সবচেয়ে বড় দুই পত্রিকা জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। পত্রিকা অফিসে সাংবাদিকদের সত্য করার চেষ্টা করা হলো। শূন্য থেকে গজিয়ে ওঠা, অমানবিকভাবে সত্যের শিকার মানুষটার জন্য দেশের ২য় বৃহত্তম জানাজা হলো। জাতীয় কবির কবর ৫০ বছর পর খুঁড়ে সেখানে তাকে দাফন করা হলো। জুলাই-এর সবচেয়ে বড় নেতা নাহিদ হলেও কি কোনোদিন নজরুলের কবর খোঁড়া সম্ভব ছিল? ছিল না। কিন্তু হাদির ক্ষেত্রে এসব ইর্যাশনাল কাজ করা হলো।
আবু সাঈদদের তুলনায় একটা মানুষের প্রায় কোনো কৃতিত্ব না থাকার পরেও, শূন্যের উপর দাঁড় করিয়ে একজন সত্যের শিকার অ্যাক্টিভিস্টকে রাতারাতি ন্যাশনাল হিরো বানানো হয়েছে। তার পরিবারকে দুইবারে দুই কোটি টাকা দেওয়া হলো। তার বড় ভাইকে চাকরি দেওয়া হলো। শুধু ক্ষতিপূরণ হিসেবে চাকরি দিলে ব্যাংক, বীমা, মেট্রোরেলে চাকরি দিতে পারতো। কিন্তু সেটা না। ক্ষতিপূরণের চেয়েও বড় এজেন্ডা হয়েছে প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়ার সুযোগ দেওয়া। ওসমান হাদির বড় ভাইকে রাতারাতি উর্ধ্বতন কূটনীতিক বানিয়ে ফরেন মিনিস্ট্রির মতো সংবেদনশীল জায়গায় পাঠানো হলো। দায়িত্ব দেওয়া হলো যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনে।
সবাই জানে হাদির সত্যকারী ফয়সাল ভারতে পালিয়ে গেছে। তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না। তাকে না পেয়ে তার ১৪ গোষ্ঠীকে পুলিশ জেলে ভরেছে। সরকারের দিক থেকে যা যা করা সম্ভব সব করেছে। কিন্তু তারপরও ইনকিলাব মঞ্চ বিচার চাইছে।
এখন ইনকিলাব মঞ্চ জাতিসংঘের তদন্ত চাইছে কিন্তু সেই দাবি তারা গুলশানে গিয়ে করছে না। করছে যমুনায় গিয়ে। কীভাবে এই বিচার হবে তার উপায় দেখাচ্ছে না। তারা শাহবাগ আটকে রাখছে, তারা যমুনা ঘেরাও দিচ্ছে। অথচ এর চেয়ে ১৪০০ গুণ বড় অপরাধ করে এক আপা দিল্লিতে বসে আছে। কোনোদিন দেখলাম না তারা আপার বিচারের দাবিতে শাহবাগ ঘেরাও করেছে। ১৪০০ মানুষের লাশের চেয়ে হাদির লাশ কবে এবং কীভাবে বড় হলো? কেন এই প্রশ্ন করতে পারাটাও এখন ঝুঁকিপূর্ণ?
হাদির স্ত্রী তো এও বলতে পারতেন, লাগবে না আমার টাকা। আমি বিচার চাই। কিন্তু তিনি টাকা নিলেন। বড় ভাই বলতে পারতেন, লাগবে না আমার চাকরি। আমার বিচার চাই। কিন্তু ঠিকই চাকরি নিলেন। তারা একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটাচ্ছেন, ব্লকেড দিচ্ছেন, সুবিধা দিচ্ছেন। কিন্তু ঢেকুর তুলে ফের বলছেন বিচার চাই।
নাজমুল আহসান ভাই এ প্রসঙ্গে লেখেন, “সরকারেরই সহযোগীরাই সরকারের কাছে আন্দোলন করছে—এমন ফুটেজখোরি আন্দোলন শেষবার সবচেয়ে বড় আকারে শাহবাগে দেখা গিয়েছিল ১৩ বছর আগে।”
বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের নাম যমুনা। ৫ই আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশের মানুষ যমুনাকে আলাদিনের চিরাগ মনে করতে শুরু করে। যে যার মতো দাবি-দাওয়া নিয়ে যমুনায় চলে গিয়ে হাঙ্গামা করে। প্রধান উপদেষ্টার জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত হতে পারে ভেবে এসএসএফ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যমুনাকে ঘিরে ৭ স্তরের নিরাপত্তার বলয় তৈরি করে। শাহবাগের দিক থেকে এই বলয়ের শুরু হচ্ছে ইন্টারকন্টিনেন্টালের গেট। সিদ্ধান্ত হয় যে কোনোবিধেই কোনো আন্দোলন, মিছিলকে প্রথম স্তর পার হতে দেওয়া হবে না। ২০০০ লোকের মবকে যেকোনোবিধেই ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো ফোর্স যমুনার চারদিকে সার্বক্ষণিক মোতায়েন করা হয়। ৭টা আলাদা আলাদা বাহিনী ও বিশেষায়িত বিভাগ এই দায়িত্ব ভাগ করে নেয়।
যমুনার নিরাপত্তা কেমন, যমুনার নিরাপত্তার বলয় ভাঙতে গেলে কী হবে—সেটা বাংলাদেশের সকল ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় ইনটেলিজেন্সের পরিষ্কার জানা আছে। যারা জানতো না তারা ইতোমধ্যে যমুনা ঘেরাও করতে গিয়ে মার খেয়ে এসে বাকিদেরও জানার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।
কিন্তু আজকের দিন ছিল ব্যতিক্রম। ওসমান হাদি কার্ড খেলার জন্য, এবং প্রধান উপদেষ্টা ইনকিলাব মঞ্চের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকার কারণে পুলিশ ইতস্তত করে হলেও তাদের ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রস করতে দিয়েছে। এরপর তারা মিন্টো রোডে ঢুকে যায়। নিরাপত্তা কর্মীদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে শুরু করে।
ইনকিলাব মঞ্চ স্পেশাল ফোর্স আর আর্মড পুলিশের পরীক্ষা নিচ্ছিল। ঠিক কতটুকু বাড়াবাড়ি করলে ফোর্স আমাদের পিটাবে তার যেন খেলা চলছিল। ছাত্র জনতা একেবারে যমুনার মেইন গেট দিয়ে ঢোকার জন্য উদ্যত হয়। এবার আর কোনো কথাই চলতে পারে না। ইনকিলাবের নেতারা যমুনার কম্পাউন্ডে ঢুকে যাবে—এটা পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের গার্ডই সহ্য করবে না। আর্মড পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। স্পেশাল ফোর্স গেট ঘিরে দাঁড়ায়। পিটিয়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। একবার পুলিশ ফোর্স ব্যবহার করা শুরু করলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে যায়। তাছাড়া ব্যক্তিগত পুলিশের কারও কারও ক্ষোভও থাকতে পারে ইনকিলাবের বিরুদ্ধে। সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু এটা কস্মিনকালেও সম্ভব না যে অন্তর্বর্তী সরকার ইনকিলাব মঞ্চের উপর লিথাল ওয়েপন ব্যবহার করবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিশ্চিত করে যে জাবেরের গায়ে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি। কিন্তু নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী যেভাবে ডিম ফেটে আহত হন, এখানেও কীভাবে যেন ফাতেমা জুমার মতো একজন নারী পর্যন্ত আহত হয়েছেন যাকে যমুনার ফোর্স স্পর্শ না করার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। কীভাবে কীভাবে যেন এইদিনই যমুনার পুলিশের হাতে মার খেতে রাজশাহী থেকে ভাইরাল আম্মা চলে এসেছে। জামায়াতের ফান্ডে চলা নন-জামাত পপুলিস্ট ৩ হিরো জাবের, রনি, আম্মা মার খেয়ে নির্বাচনের ৫ দিন আগে আরও বড় হিরো হয়ে উঠেছে।
মেইনস্ট্রিম মিডিয়া কী বললো আর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস বিজ্ঞপ্তি কী দেওয়া হলো তাতে কিছু যায় আসে না। জামাতের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত মিম পেজ ও গ্রুপগুলো, নিউ মিডিয়াগুলো তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে দিবে যে জাবেরকে গুলি করেছে ইউনূস সরকার। যেভাবে জিরো এভিডেন্সের উপর বেস করে বাংলাদেশের মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছে যে আসিফ নজরুল ভারতের দালাল, তেমনি বাংলাদেশের মানুষকে শূন্যের উপর দিয়ে যেকোনো কিছু বিশ্বাস করানো সম্ভব। এবং কীভাবে এই সম্ভবটা করতে হবে—তা জামায়াত ওরফে ইনকিলাব মঞ্চ ওরফে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ ওরফে আনোয়ার টিভির ভালো করে জানা আছে।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ৫ দিন পর দেশের ক্ষমতায় আসবে বিএনপি। কিন্তু ইনকিলাব মঞ্চ আজকে যে মেটিকুলাস ডিজাইনে কাজ করলো তার ফলে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ ভাববে, বিশেষ করে জেন-জি ভাববে ইউনূস সরকার বিএনপির পক্ষে কাজ করেছে, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে জামায়াতকে হারিয়ে দেওয়া হলো।
জামায়াতে ইসলামি, তাদের পিআর, তাদের মাস্টারমাইন্ড, তাদের ইনফ্লুয়েন্সার, তাদের কনসালট্যান্টরা সাউথ ইন্ডিয়ান মুভির লেভেলে নেমে রাজনীতি করছে।
