দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ২০২৫ সালে বিভিন্ন হামলার ঘটনায় ৬০১ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গড়ে প্রতি মাসে আহত হয়েছেন ৫০ জন এবং প্রতিদিন গড়ে একজনেরও বেশি পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। মাঠপর্যায়ে অপরাধ দমন, হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ নিয়ন্ত্রণ এবং ‘মব’ সহিংসতা ঠেকাতে গিয়ে এসব হামলার শিকার হন তাঁরা।
পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, আহতদের বড় অংশই সংঘবদ্ধ জনতার হামলার শিকার। অনেক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকেছেন এবং কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। তবে নিহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার ময়মনসিংহের দিগরকান্দা ফিশারি মোড় এলাকায় আসামি ধরতে গিয়ে পুলিশের ওপর হামলায় পাঁচ সদস্য গুরুতর আহত হন। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. নাজমুস সাকিব জানান, বিকেল ৪টার দিকে আসামিকে আটক করার সময় পুলিশ সদস্যদের কুপিয়ে জখম করা হয় এবং হাতকড়াসহ আরিফুল ইসলাম নামের এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয় তার সহযোগীরা। আহত পুলিশ সদস্যরা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানার শতাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক পুলিশ সদস্য জানান, অভিযানে গেলেই সংঘবদ্ধ হামলার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, যা তাঁদের মনোবলে প্রভাব ফেলছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মহানগর পুলিশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদস্যরা—মোট ৮৯ জন। রেঞ্জ পুলিশের মধ্যেও ঢাকা রেঞ্জে আহতের সংখ্যা বেশি।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, “পুলিশের ওপর এভাবে হামলা চলতে থাকলে জনগণকে একসময় নিজের ঘরবাড়ি নিজেরাই পাহারা দিতে হবে।”
পুলিশের তথ্যমতে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে ১০ জন আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়। সারাদেশে অন্তত ৪৪টি ঘটনায় ৪১ জন আসামি পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে গেছে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, “আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ বারবার হামলার শিকার হচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতি অনুরোধ—পুলিশকে আবার কাছে টেনে নিন, সহায়তা করুন।” তিনি জানান, পুলিশকে আবার কর্মক্ষম ও জনবান্ধব করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মনোবল ফেরাতে উদ্যোগ ও সংস্কার
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, আহত পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা ও নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কাউন্সেলিং, মতবিনিময় এবং মনোবল বৃদ্ধির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যাতে আসন্ন নির্বাচনে পুলিশ সদস্যরা সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
এ ছাড়া পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন যুগোপযোগী করা, নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনার লক্ষ্যে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “পুলিশ দুর্বল থাকুক এটাই চায় অপরাধী ও সন্ত্রাসীরা। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজসহ সবাইকে পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে।”
