বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি প্রশ্ন শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পেছনে কি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক চাপ এবং বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানির স্বার্থ কাজ করেছে? বিশেষ করে বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ, মার্কিন তেল কোম্পানি এক্সন মবিল এবং তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক ও বিশ্লেষক মহলে নানা আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রসীমার ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এই বিস্তীর্ণ এলাকায় তেল-গ্যাসের পাশাপাশি ভারী খনিজ বালু ও গ্যাস হাইড্রেটের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ফলে বঙ্গোপসাগরের এই অঞ্চল দ্রুতই বহুজাতিক জ্বালানি কোম্পানির আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ২৬টি অফশোর ব্লক ঘোষণা করে। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে সিসমিক সার্ভে, ২০১৯ সালে প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট (পিএসসি) সংস্কার, ২০২১ সালে নতুন মডেল চুক্তি এবং ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক নিলামের ঘোষণা দিয়ে সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। সরকারের অবস্থান ছিল—আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক বিডিংয়ের মাধ্যমেই ব্লক বরাদ্দ দেওয়া হবে।
তবে রাজনৈতিক ও বামপন্থী সংগঠনগুলোর একটি অংশের অভিযোগ, এই স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নীতিই কিছু বড় বহুজাতিক কোম্পানির প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে। তাদের দাবি, বিশেষ করে এক্সন মবিল প্রতিযোগিতাহীন বা সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে বড় আকারের অফশোর ব্লক এককভাবে পেতে আগ্রহী ছিল। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এমন কোনো চুক্তির কথা অস্বীকার করলেও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতাও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, জ্বালানি খাতে মার্কিন বিনিয়োগ এবং এক্সন মবিলের প্রস্তাব নিয়ে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের একটি সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে সরকার বিডিং ছাড়া কোনো চুক্তিতে রাজি হয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, শেখ হাসিনার এই অনড় অবস্থানই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি করে। তাদের মতে, সমুদ্রসম্পদ ও জ্বালানি নীতিতে সরকারের স্বাধীন ও কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।
অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে জ্বালানি খাতে কিছু সিদ্ধান্ত ও তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় আসে। বিশেষ করে মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল ও সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিরোধী দল ও প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর দাবি, নতুন সরকার আগের সরকারের কঠোর নীতিগত অবস্থান থেকে সরে এসে বিদেশি কোম্পানির জন্য জ্বালানি খাত আরও সহজ করার পথে হাঁটছে।
তবে সরকারপক্ষ বলছে, গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিনির্ভর। বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ছাড়া এই খাতে অগ্রগতি সম্ভব নয়। তবে যেকোনো অংশীদারিত্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই করা হবে—এমন আশ্বাস দিচ্ছে তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মুনির আহমেদ বলেন,
“সমুদ্রসম্পদ নিয়ে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত কেবল জ্বালানি নীতি নয়, এটি একটি ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এখানে যেকোনো বিদেশি চাপ বা একচেটিয়া চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।”
অন্যদিকে জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, স্বচ্ছ বিডিং, প্রতিযোগিতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা গেলে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে কাজ করলেও দেশের ক্ষতি হওয়ার কথা নয়। তবে একচেটিয়া চুক্তি ভবিষ্যতে বড় সংকট ডেকে আনতে পারে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী আলোচনার কেন্দ্রে—শেখ হাসিনার সরকার কি সমুদ্রসম্পদ ও জ্বালানি নীতিতে স্বাধীন অবস্থান নেওয়ার কারণেই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছিল? আর সেই চাপ কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে?
এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এখনো মেলেনি। তবে পিটার হাসের কূটনৈতিক তৎপরতা, এক্সন মবিলের আগ্রহ এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসম্পদ নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান এই তিনটি বিষয় ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আগামী দিনে দেশের রাজনীতি ও জ্বালানি নীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
