ফোরটিন ডেস্ক :
“ছোটভাইকে ফোন করে বলেছিলাম আমাদের থানা অ্যাটাক করেছে। আমি মনে হয় আর বাঁচবো না। সুযোগ নাই আমাদের বাঁচার। এটাই আমার শেষ কথা জীবনের। আমার সন্তানগুলো দেখে রাখিস। আমার সঙ্গে কথা হবে না আর…।”
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী গণআন্দোলনের শেষ লগ্নে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় তাণ্ডবের সময় নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরিবারকে শেষ বিদায় জানানোর লোমহর্ষক বর্ণনা দিচ্ছিলেন এসআই আব্দুল মালেক। সেদিনের সেই রক্তক্ষয়ী হামলায় এনায়েতপুর থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জসহ (ওসি) মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন।
প্রথমে আবেদন, পরে হাজার হাজার মানুষের তাণ্ডব
পুলিশ ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালের দিকে ৫ থেকে ৬ হাজার আন্দোলনকারী মিছিল নিয়ে প্রথম দফায় থানার দিকে আসে। পুলিশের অনুরোধে তখন তারা ফিরে গেলেও দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে আবারও হাজার হাজার মানুষ একজোট হয়ে সরাসরি থানায় হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় এক আখ ব্যবসায়ী জানান, আন্দোলনকারীরা শেখ হাসিনার পতন চেয়ে স্লোগান দিতে দিতে থানার দিকে ধেয়ে আসে। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুঁড়লে আন্দোলনকারীদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
ঘটনাস্থলে থাকা এসআই আব্দুল মালেক জানান, “হাজার হাজার লোক মারমুখী আচরণ করে সরাসরি থানায় আক্রমণ করে। যখন ভেতরে ঢুকে আক্রমণ শুরু করে, তখন আমরা আর পরিস্থিতি কন্ট্রোল করতে পারি নাই। তবে আমাদের ইচ্ছা ছিল না কাউকে গুলি করে মারব। আমাদের ইচ্ছা থাকলে তো থানার বাউন্ডারিতে ঢোকার আগেই ১০-১৫টা ফেলা যেত। লাস্টে তো আমরা নিজেরাই শেষ হয়ে গেলাম।”
বাথরুমে ঢুকেও মেলেনি রক্ষা, গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় মরদেহ
থানায় অগ্নিসংযোগ ও হামলার পর পুলিশ সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে পেছনের পথ দিয়ে সংলগ্ন ঘরবাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু উন্মত্ত জনতা বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে, এমনকি বাথরুমে লুকিয়ে থাকা সদস্যদের বের করে পিটিয়ে হত্যা করে। ঘটনার দিনই থানার আশপাশ থেকে ১৩ জন পুলিশের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যার মধ্যে এক পুলিশ সদস্যের মরদেহ স্থানীয় বাজারের একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। হামলার সময় থানার ১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রচুর গুলি লুট হয়, যার মধ্যে এখনও ৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার দিন পানির ট্যাংকের নিচে ওসি তদন্তসহ চারজন লুকিয়ে ছিলেন। পরে সন্ধ্যার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে আহত অবস্থায় তাঁদের উদ্ধার করেন। পরিস্থিতির এতটাই অবনতি হয়েছিল যে, ৬ আগস্ট উদ্ধারকৃত জীবিত ও আহতদের লাশবাহী গাড়িতে কাফনের কাপড়ে মুড়ে সিরাজগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
‘অন্তঃসত্ত্বা কনস্টেবল হত্যা’র গুজব ও নির্মম সত্য
এনায়েতপুর থানায় হামলার দিন মোট ৫৭ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে ৩ জন নারী কনস্টেবল ছিলেন। তাঁদের একজন জানান, আক্রমণের সময় তিনি ও তাঁর এক সহকর্মী পেছনের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে চরম মারধরের শিকার হন তাঁরা।
তৎকালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘অন্তঃসত্ত্বা নারী পুলিশ সদস্য নিহত’ হওয়ার যে খবর ছড়িয়ে পড়েছিল, তার নেপথ্যের সত্য তুলে ধরেন ওই নারী কনস্টেবল। তিনি জানান, তিনি মূলত অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন না (অন্য ৩ জন নারী সদস্য মাতৃত্বকালীন ছুটিতে ছিলেন)। হামলার হাত থেকে রক্ষা করতে তাঁর সহকর্মী কনস্টেবল রবিউল ইসলাম বানিয়ে বলেছিলেন“ওর পেটে বাচ্চা আছে, একে মেরো না।”
এই আকুতি শুনে কয়েকজন স্থানীয় তরুণ তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও আক্রমণকারীদের বেধড়ক পেটানো থামেনি। মাথায় মারাত্মক জখম ও শরীরে অসংখ্য আঘাত নিয়ে তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। সন্ধ্যায় হাসপাতালে তাঁর জ্ঞান ফেরে। তবে তাঁকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা সাহসী সহকর্মী রবিউল ইসলামকে ওই দিন নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
চাপের মুখে মামলা ও বর্তমান তদন্ত চিত্র
পুলিশ হত্যার এ ঘটনায় ২৪ দিন পর ২৬ আগস্ট এনায়েতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আহম্মদ মোস্তফা খান বাচ্চুকে ১ নম্বর আসামি করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ৪ নেতা ও অজ্ঞাতনামা ৫-৬ হাজার জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ১ নম্বর আসামি বাচ্চু পরবর্তীতে কারাগারে থাকা অবস্থায় মারা যান। এছাড়া সাবেক এমপি ও মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাসসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন।
মামলার বাদী এসআই আব্দুল মালেক জানান, মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত থাকায় কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তিনি শুধু স্বাক্ষর করেছিলেন; এজাহার পুলিশ প্রশাসন নিজেই তৈরি করেছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে, তৎকালীন নাজুক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়ে তড়িঘড়ি করে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি রুজু করতে হয়েছিল।
সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশের তথ্যানুযায়ী, এ ঘটনায় মোট ৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল (১টি পুলিশ হত্যা ও ৩টি আন্দোলনকারী হত্যার)। পুলিশ হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।
