মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব সন্ত্রাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৯৭ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ৭১ জন বেশি।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর ২০২৫ সালের বাৎসরিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু মব সন্ত্রাস নয় একই সময়ে বেড়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারা হেফাজতে মৃত্যু, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও।
আসক জানায়, কোনো ধরনের প্রমাণ, তদন্ত বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সন্দেহ ও গুজবের ভিত্তিতে মানুষকে মারধর ও হত্যা করা হয়েছে। ‘তৌহিদি জনতা’র নামে বেআইনিভাবে মব তৈরি করে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্র ভাঙচুর, বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এমনকি কবর থেকে তুলে লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মুক্তিযোদ্ধাসহ বিরুদ্ধ মতের মানুষকে প্রকাশ্যে হেনস্তার ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত। এসব ঘটনায় বহু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে উদাসীনতার প্রবণতা স্পষ্ট।
আসকের হিসাবে, ২০২৪ সালে মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছিলেন অন্তত ১২৮ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল মিলিয়ে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ২৯৩ জনে।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে সর্বাধিক নিহত হয়েছেন ঢাকা জেলায় ২৭ জন। এরপর গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে ৯, কুমিল্লায় ৮ জনসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই এ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু ১০৭
২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৯ জন হাজতি এবং ৩৮ জন কয়েদি। সর্বাধিক মৃত্যু ঘটেছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৩৮ জন। ২০২৪ সালে কারাগারে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬৫।
কারাগারে মৃত্যুর কয়েকটি ঘটনায় তীব্র বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান সুজন ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনের মৃত্যু নিয়ে পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে মৃত্যুর পরও হাতকড়া পরানো অবস্থায় মরদেহ বহনের ছবি জনমনে ক্ষোভ তৈরি করে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতা
২০২৫ সালে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে অন্তত ৩৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ২১।
রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। চলতি বছরে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০২ জন, আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন। এর বড় অংশই দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে সংঘটিত হয়েছে, বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে প্রাণ গেছে ৩৯ জনের।
সাংবাদিক ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
২০২৫ সালে অন্তত ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে মামলা, হামলা, প্রাণনাশের হুমকি এবং হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলাকে আসক বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমাধ্যমের ওপর ‘জঘন্যতম হামলা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
একই সময়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর অন্তত ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বসতঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাঙচুরের মাধ্যমে সংবিধানপ্রদত্ত ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বলপ্রয়োগ ও জবাবদিহির ঘাটতি আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা আরও দুর্বল করেছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সহনশীলতার সংকট ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন।
