রংপুরের তারাগঞ্জে ভ্যানচোর সন্দেহে দুই নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ‘মব সন্ত্রাসের’ একটি নির্মম উদাহরণ। গত ৯ আগস্ট তারাগঞ্জ উপজেলার বটতলা এলাকায় রুপলাল দাস (৪০) ও প্রদীপ দাস (৩৫) নামের দুই ব্যক্তিকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। রুপলাল দাস পেশায় ছিলেন জুতা সেলাইকার, আর প্রদীপ দাস ভ্যানচালক। আত্মীয়ের মেয়ের বিয়ের দিন ঠিক করতে যাওয়ার পথে ভ্যানচোর গুজবে তাঁদের হত্যা করা হয়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং জনসমাগম বাড়তে দেখে পুলিশ এলাকা ত্যাগ করে—এমন অভিযোগ রয়েছে।
এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। আসকের ২০২৫ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে মব সন্ত্রাসে অন্তত ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১২৮। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ২৯৩ জনে।
আজ বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আসক বলেছে, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতি ঘটেছে। মব সন্ত্রাসের পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকা জেলায় মব সন্ত্রাসে সর্বোচ্চ ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এরপর গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে ৯ জনসহ দেশের প্রায় সব জেলাতেই এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।
কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগজনক। চলতি বছরে দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তত ১০৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৬৯ জন হাজতি। বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৮ জন।
রাজনৈতিক সহিংসতায় ২০২৫ সালে ৪০১টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০২ জন, আহত প্রায় ৪ হাজার ৭৪৪ জন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো দলীয় অভ্যন্তরীণ সহিংসতা, বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৩৯ জন নিহত হয়েছেন।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও কঠোর ভাষায় উদ্বেগ জানিয়েছে আসক। চলতি বছরে ৩৮১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে গণমাধ্যমের ওপর ‘জঘন্যতম হামলা’ বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্রও ভয়াবহ। ২০২৫ সালে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৪২টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, মন্দির ভাঙচুর ও জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে একাধিক স্থানে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী শাহদীন মালিক বলেন, মব সন্ত্রাস ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কমাতে ব্যর্থ হওয়া এই সরকারের স্পষ্ট ব্যর্থতা। এসব ঘটনা সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের জবাবদিহির সংকটকেই তুলে ধরে।
আসকের সিনিয়র সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর বলেন, মব সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গণমাধ্যমের ওপর হামলা সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা নয়, বরং সহনশীলতার গভীর সংকটের প্রতিফলন।