নিজস্ব প্রতিনিধিঃ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল প্রকল্প হওয়ার পাশাপাশি এখন ব্যয়–বৃদ্ধি ও সময়–পিছিয়ে যাওয়ার প্রতীকে পরিণত হচ্ছে। অনুমোদনের এক দশক পরও কাজ শেষের কোনো স্পষ্ট সংকেত নেই। বরং নতুন হিসাব, সংশোধন ও অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপই বাড়ছে।
সর্বশেষ প্রস্তাব অনুযায়ী ব্যয় আরও ২৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা বাড়ছে। এতে মোট ব্যয় দাঁড়াবে এক লাখ ৩৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা, যা মূল অনুমান থেকে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। ২০১৬ সালে প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা।
ব্যয়ের পাশাপাশি বাড়ছে সময়ও। প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে চলতি ডিসেম্বরেই ইউনিট–১ চালু করার যে পরিকল্পনা ছিল, তা আর বাস্তবসম্মত নয়। ইউনিট–২–এর সময়সূচিও অনিশ্চিত।
ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও স্বচ্ছতার ঘাটতি। এর মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টে একটি অনলাইন পোর্টালের প্রতিবেদন থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও আলোচনায় আসে; পরে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এটিকে ‘ভিত্তিহীন’ ও ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
কেন বাড়ছে ব্যয়
রূপপুর প্রকল্পটি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার আন্তঃসরকার চুক্তির আওতায় তৈরি হচ্ছে। রাশিয়ার অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট কোম্পানি দুটি ১২০০ মেগাওয়াট ইউনিট নির্মাণ করছে, আর জ্বালানি সরবরাহ করছে টিভিইএল।
নতুন ব্যয়–বৃদ্ধির প্রধান কারণ বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পুনর্মূল্যায়ন। প্রকল্পের ডলার–ভিত্তিক ব্যয় একই থাকলেও টাকার অবমূল্যায়নের কারণে মোট ব্যয় স্থানীয় মুদ্রায় অনেক বেড়ে গেছে। করোনাপরবর্তী আমদানি–চাপ এবং রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ডলারের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। ৮৫ টাকা থেকে ডলার ১১৫ টাকা ছুঁয়ে ফেলে।
পরিকল্পনা কমিশনের হিসাব বলছে বিদ্যমান প্রস্তাবে প্রকৃত বিনিময় হার পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি, আর তাই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাদের অনুমান অনুযায়ী মোট ব্যয় ১.৩৯ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছানো বাস্তবসম্মত।
এ পর্যন্ত ৮.২৯ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, যার গড় বিনিময় হার ছিল ৯৫ টাকা। বাকি ৩.০৯ বিলিয়ন ডলার খরচের ক্ষেত্রে প্রতি ডলার ১২২ টাকার বেশি ধরা হয়েছে।
পুরো প্রকল্পের ৯০ শতাংশ অর্থায়নই রাশিয়ার ঋণ। এখন পর্যন্ত ৭.৭০ বিলিয়ন ডলার এসেছে। বাকি অর্থ ২০২৬ সালের মধ্যে পাওয়ার কথা। তবে টাকার মান দ্রুত কমতে থাকায় ভবিষ্যতে কিস্তি পরিশোধে বড় চাপ তৈরি হবে। ২০২৯ সালের মার্চ থেকে ২০ বছরে দুই কিস্তিতে ঋণ শোধ করতে হবে। একদিন দেরি হলেও বাড়তি জরিমানা গুনতে হবে, আর সব কিছু নির্ভর করবে তখনকার বিনিময় হারের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, টাকার অবমূল্যায়ন প্রকল্পের প্রকৃত বোঝা আরও বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বাজেটে। রাজস্ব না বাড়লে ঘাটতি পূরণে সরকারের আবার ঋণ নিতে হতে পারে।
সময়সূচির নতুন অনিশ্চয়তা
ইউনিট–১ এই ডিসেম্বরেই উৎপাদনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অসমাপ্ত কাজ, নতুন সমন্বয় ও সংশোধিত সময়সূচির কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। ইউনিট–২ নির্ধারিত সময়ে চালু হবে কি না তারও নিশ্চয়তা নেই। মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ডিসেম্বরেই ফুয়েল লোডিং শুরু করতে চাইলেও পূর্ণ উৎপাদনে যেতে আরও ১০ মাস লাগবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলছেন, প্রকল্প দীর্ঘায়িত হওয়ায় ঋণের সুদ, যন্ত্রপাতির ক্ষয়, জনবলের ব্যয় সব মিলিয়ে প্রকল্পের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে।
ফিনল্যান্ডের অউলু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক এমডি মতিউর রহমান খান প্রকল্পটিকে পরিষ্কারভাবে ভূ–রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখেন। তার মতে, রূপপুর শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়; বরং রাশিয়ার বিশ্ব জ্বালানিতে প্রভাব দেখানোর কৌশলগত বিনিয়োগ। তাই ব্যয়–বৃদ্ধি বা বিলম্বের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক নয়, বৈশ্বিক রাজনৈতিক কারণও আছে।
