চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল এবং কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। বন্দর পরিচালনার ভার বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে সব শ্রমিক সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। দেশের বামপন্থী দলগুলোর পাশাপাশি এবার ডানপন্থী সংগঠনগুলোও মাঠে নামছে। দাবি আদায়ে আগামী সপ্তাহেই হরতাল ও অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও একদল শিক্ষার্থী ‘নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে এ চুক্তির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।
গত সোমবার ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে লালদিয়ার চর এবং সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ-এর সঙ্গে পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সরকার আরও টার্মিনাল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ৪৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জিটুজি পদ্ধতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এনসিটিতে আদালতের মৌখিক স্থিতাবস্থা থাকা সত্ত্বেও গত ১৬ নভেম্বর বন্দর কর্তৃপক্ষ সাত সদস্যের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে, যা সরাসরি আদালত অবমাননার শামিল বলে অভিযোগ করেছেন আইনজীবীরা।
জানা গেছে, দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও ধীরগতির অভিযোগ তুলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ ও টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রক্রিয়ায় নতুন গতি আসে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের সাতটি গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের মধ্যে পাঁচটিই বিদেশি অপারেটরদের দ্বারা পরিচালিত হতে যাচ্ছে। গোপনে ও তড়িঘড়ি করে ৩৩ বছর মেয়াদি এসব চুক্তি সম্পাদন নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রবল আপত্তি তুলেছে।
ইতোমধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, গণ-অনশন, গণমিছিল ও মশাল মিছিলের মতো কর্মসূচি পালিত হয়েছে। আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে স্কপ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাসদ, বাম গণতান্ত্রিক জোট, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এছাড়া টার্মিনাল ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ১২ দলীয় জোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে আজ বৃহস্পতিবার বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ করবে এবং আগামী শনিবার চট্টগ্রামে স্কপের জাতীয় কনভেনশন ডাকা হয়েছে। এই কনভেনশন থেকে হরতাল ও ঢাকা-চট্টগ্রাম ট্রাংক রোড অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। স্কপ ও বাম জোটের নেতারা জানিয়েছেন, সরকার দাবি না মানলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ঘেরাও এবং প্রয়োজনে লাগাতার হরতাল কর্মসূচি দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক নেতারা অভিযোগ করেছেন, জনগণের মতামত উপেক্ষা করে ও শর্ত গোপন রেখে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে যেভাবে চুক্তি করা হয়েছে তা সার্বভৌমত্ববিরোধী। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক এবং সিপিবির রুহিন হোসেন প্রিন্স মন্তব্য করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারও স্বৈরাচারী সরকারের পথে হাঁটছে এবং বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও একে দেশের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং অবিলম্বে এই অস্বচ্ছ ও গোপন প্রক্রিয়া বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।