যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত অর্থলগ্নিকারী ও দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন বহু বছর ধরেই ক্ষমতাবান মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, বিলাসী জীবনযাপন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন শোষণের অভিযোগে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। ২০১১ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে “যৌন শিকারি নই, তবে অপরাধী” বলে দাবি করেছিলেন।
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি উচ্চ নিরাপত্তা কারাগারে তার মৃত্যু হয়। সে সময় তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন পাচারের অভিযোগে বিচার শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন এবং জামিন পাননি। এর আগে ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কের কাছ থেকে যৌনসেবা নেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাভোগ করেন এবং যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত হন।
ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের উত্থান
নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এপস্টেইন শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ওয়াল স্ট্রিটে কাজ শুরু করে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। নিজস্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে বিপুল সম্পদের মালিক হন। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা ও নিউ মেক্সিকোতে বিলাসবহুল সম্পত্তি ছিল তার।
রাজনীতিক, শিল্পপতি, তারকা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল বিস্তৃত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০০২ সালে তাকে “দারুণ মানুষ” বলে মন্তব্য করেছিলেন, যদিও পরে ট্রাম্প দাবি করেন বহু আগেই সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন-সহ আরও পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তার মেলামেশার তথ্য প্রকাশ্যে আসে, যদিও এসব সম্পর্ক অপরাধের সরাসরি প্রমাণ নয়।
অভিযোগ ও বিতর্কিত সমঝোতা
২০০৫ সালে ফ্লোরিডায় এক কিশোরীর পরিবার অভিযোগ করলে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। একাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীর বক্তব্যে দীর্ঘদিনের শোষণের চিত্র উঠে আসে। কিন্তু ২০০৮ সালে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে করা একটি বিতর্কিত সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে এপস্টেইন ফেডারেল অভিযোগ এড়িয়ে মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান এবং বিশেষ সুবিধায় ‘ওয়ার্ক রিলিজ’ ভোগ করেন।
এই চুক্তিকে পরে অনেকেই বিচারব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা বলে সমালোচনা করেন। সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর আলেক্সান্ডার অ্যাকোস্টা ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন।
দ্বিতীয় দফা গ্রেপ্তার ও মৃত্যু
২০১৯ সালে আবার গ্রেপ্তার হন এপস্টেইন। নিউইয়র্কে তার বাসভবন থেকে বিপুল প্রমাণ জব্দ করা হয় বলে তদন্তকারীরা জানান। তাকে রাখা হয়েছিল মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টার-এ। বিচারের আগেই কারাগারে তার মৃত্যু হয়, যা সরকারিভাবে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নানা প্রশ্ন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি হয়।
ম্যাক্সওয়েল অধ্যায়
এপস্টেইনের দীর্ঘদিনের সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে যৌন পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড পান। আদালত বলেন, তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের শোষণে সহায়তা করেছিলেন।
‘এপস্টেইন ফাইলস’ বিতর্ক
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে “এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি” আইন পাস হওয়ার পর ধাপে ধাপে তদন্ত-সংক্রান্ত নথি প্রকাশ শুরু হয়। তবে সব নথি প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক এখনো চলছে। প্রকাশিত নথিগুলোতে এপস্টেইনের সামাজিক নেটওয়ার্ক, ভ্রমণ ও যোগাযোগের বিস্তৃত তথ্য উঠে এসেছে।
প্রভাব আজও শেষ হয়নি
জেফ্রি এপস্টেইনের মৃত্যুর পরও তার মামলাকে ঘিরে প্রশ্ন, বিতর্ক ও প্রভাব শেষ হয়নি। ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাবশালী সম্পর্ক কীভাবে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে—তার একটি বহুল আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে এই নামটি।
