উপেন কহিল, “এবার পূজো সেরা হইয়াছে।”
আমি মুচকি হাসিয়া কহিলাম, “হুমম, তা তো বটেই! স্বয়ং অসুর যখন রাজসিংহাসনে সমাসীন, তখন আর দুষ্টুমি করিবে কে? তা উপেন, বলো তো চিন্ময় প্রভুকে জেলে পুরিয়া রাখিয়া এই অসুর মহারাজ কোন ‘অসাম্প্রদায়িক’ স্বর্গরাজ্য গড়িয়া তুলিলেন?
লন্ডন হইতে রাজকীয় সফর সারিয়া এই অসুর কি একবারও দীপু চন্দ্র দাসের পোড়া ভিটায় গিয়াছিল? অথচ আবু সাঈদের দুয়ারে তো তাহার পদধূলি পড়িতে দেখিলাম। সে কি খবর রাখিয়াছিল—২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপুকে জীবন্ত পুড়াইয়া অঙ্গার করিয়া দেওয়া হইয়াছিল? সে কি জানিত খোকন চন্দ্র দাসের পরিণতি? ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শরীয়তপুরের ডামুড্যায় হামলায় খোকনের শরীর আগুনে ঝলসাইয়া দেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়েন তিনি। আর চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিকের কথা কি তাহার কানে পৌঁছায় নাই? ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি নরসিংদীর এক গ্যারেজে ঘুমান্ত অবস্থাতেই তো আগুনে পুড়িয়া লাশ হইলেন তিনি!
অসুর মহারাজ কেন গেলেন না সেই স্বজনহারাদের উঠানে? খোঁজ লইলেন না কেন? তবে কি ‘জামাত মাতা’ গোস্বা করিবেন বলিয়া? অসাম্প্রদায়িকতার বয়ান তো তখনই সত্য হইত, যদি হিন্দু-মুসলিম উভয়ের অশ্রুর দাম দেওয়া যাইত। কিন্তু অসুরপতির কাছে কি তাহা শোভা পায়?
শোনো উপেন, হিসাবটা এবার মিলাইয়া লও। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে দুর্গাপূজার প্রাক্কালেই প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দির আক্রমণ ও সংশ্লিষ্ট সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়াছে অন্তত ৩৪টি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএস (HRSS)-এর হিসাবে, বছরের প্রথম ছয় মাসেই অন্তত ১৫টি বিগ্রহ আক্রান্ত ও ভাঙচুরের শিকার হইয়াছে। আর বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের পরিসংখ্যান বলিতেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি হইতে জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন মন্দির ও উপাসনালয়ে অন্তত ৬২টি হামলা ও তাণ্ডব চালানো হইয়াছে।”
শুনিয়া মলিনমুখে উপেন বলিল, “এসব আমি বিশ্বাস করি না।”
আমি বলিলাম, “অবিশ্বাস্য লাগিলেও নিষ্ঠুর সত্য উপেন, আরও তবে শুনো—গত ৩ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরের মালোপাড়া সার্বজনীন শ্রীশ্রী মা কালী মন্দিরে পাঁচটি প্রতিমা ভাঙিয়া ফেলা হইল, পুলিশ ও সেনা সদস্যরা কেবল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিয়াই দায় সারিলেন। ১২ জুন বগুড়ার মোকামতলার কাঞ্চগাড়িতে একযোগে তিনটি মন্দিরে প্রতিমা গুঁড়াইয়া দেওয়া হইল; হিন্দু সম্প্রদায় সেখানে কেবল এক নিরপেক্ষ তদন্তের আর্তনাদই করিয়া গেল। গত ১ অক্টোবর টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের জামুরকি পশ্চিমপাড়ায় পূজার জন্য নির্মিত সাতটি প্রতিমা ভাঙিয়া মাটিতে মিশাইয়া দেওয়া হইল। ১৮ জুন ফরিদপুরের মধুখালীর বামুন্দি সার্বজনীন কালী মন্দিরে শিবের প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত করার পর কেবল পুলিশকে খবরই দেওয়া সম্ভব হইয়াছে। উপেন, তুমি কি আরও ফিরিস্তি শুনিতে আগ্রহী?”
এবার স্তব্ধ ও মলিন মুখে উপেন শুধাইল, “তবে কি এই সবটাই সাজানো ভেলকিবাজি? সেই ২০২৪-এর জুলাই হইতে ধোঁকার উপরেই কি আমরা বোকা বনিয়া রহিলাম! তবে এই ছদ্মবেশী মুখোশের শেষ কোথায়? কে বিদায় করিবে এই অসুরকে?”
আমি সান্ত্বনা দিয়া বলিলাম, “উপেন বাবু, বিচলিত হইবেন না। শুধু চোখ-কান খোলা রাখুন আর মা মহামায়ার বাহনে চড়িয়া বসুন। বাকি বিচারটা প্রকৃতি আর সময়ের হাতেই ছাড়িয়া দিন।”
লেখক: ফাতেমা তুজ জোহরা , আইন শিক্ষার্থী
