নিজস্ব প্রতিবেদক, সংবাদ প্রকাশ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের জেরে বিভিন্ন সময়ে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাঁচ সাংবাদিক। তাদের মধ্যে কেউ গুলিতে, কেউ ধারালো অস্ত্রের আঘাতে, আবার কেউ সন্ত্রাসীদের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পর দীর্ঘদিনের শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে মারা গেছেন।
এসব হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচার নিয়ে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটছে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের সদস্যদের।
নিহত সাংবাদিকেরা হলেন নেত্রকোনার দুর্গাপুরের লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার আসাদুজ্জামান তুহিন, জামালপুরের বকশীগঞ্জের গোলাম রব্বানী নাদিম, ময়মনসিংহের স্বপন কুমার ভদ্র ও জামালপুরের শেলু আকন্দ।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে সরব হয়েছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, এসব হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে নিহত সাংবাদিকদের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে হবে। এ দাবিতে রাজপথে আন্দোলনেরও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
আলিফ ফকির
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির সাংবাদিকতা করতেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার প্রতিনিধি হিসেবে। পাশাপাশি অনুসন্ধানী ফেসবুক পেজ ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পরিচালনা করতেন তিনি।
দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর বালুঘাটসহ স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন আলিফ।
গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে একটি চায়ের দোকানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে পূর্বশত্রুতার কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তুহিন
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তান আসাদুজ্জামান তুহিন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন।
২০২৫ সালের ৭ আগস্ট রাতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনার রাতে একটি মারধরের ঘটনা মুঠোফোনে ধারণ করেছিলেন তুহিন। স্থানীয় সন্ত্রাসীরা তাকে ভিডিওটি মুছে ফেলতে বলে। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ভিডিও মুছতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। এরপর তাকে ধাওয়া করে একটি চায়ের দোকানে অবরুদ্ধ করা হয়। সেখানে চাপাতি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
নাদিম
অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের জামালপুর জেলা প্রতিনিধি ছিলেন গোলাম রব্বানী নাদিম। জামালপুরের বকশীগঞ্জে স্থানীয় এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
২০২৩ সালের ১৪ জুন রাতে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে বকশীগঞ্জ উপজেলার পাটহাটি এলাকায় হামলার শিকার হন নাদিম। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন ১৫ জুন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
স্বপন ভদ্র
প্রবীণ সাংবাদিক স্বপন কুমার ভদ্র স্থানীয় একটি পত্রিকায় কাজ করতেন। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ও রঘুরামপুর এলাকায় মাদক ব্যবসা ও চোরাচালান নিয়ে নিয়মিত লিখতেন তিনি।
২০২৪ সালের ১২ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ বাজারের মাঝিপাড়া এলাকায় তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে তিনি ক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের আক্রোশের শিকার হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
শেলু আকন্দ
জামালপুরের সাংবাদিক শেলু আকন্দ দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি এবং জামালপুর পল্লীকণ্ঠ প্রতিদিনের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। স্থানীয় ভূমিদস্যু ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন তিনি।
২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়া এলাকায় তার ওপর হামলা হয়। হামলাকারীরা লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে তার দুই পা গুরুতরভাবে জখম করে। এরপর দীর্ঘ পাঁচ বছর পঙ্গুত্ব ও শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করেন তিনি। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির (বাসাস) কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক বাবুল ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের চেয়ারম্যান খায়রুল আলম রফিক বলেন, ময়মনসিংহ অঞ্চলের গণমাধ্যম এখন কঠিন সময় পার করছে। সাংবাদিক তুহিন, আলিফ, নাদিম, স্বপন ভদ্র ও শেলু আকন্দের হত্যাকাণ্ড স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত।
তারা বলেন, ‘আমরা এই পাঁচ সাংবাদিক হত্যার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিষ্পত্তি চাই।’
সাংবাদিক নেতারা এসব হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি নিহত সাংবাদিকদের পরিবারের নিরাপত্তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
Comments
