নিজস্ব প্রতিবেদক
গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় খ্যাতনামা শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেয়া গ্রুপের চারটি কারখানার ৭৩৯ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে দ্বিতীয় দফায় ছাঁটাই করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কারখানার প্রধান ফটকে ছাঁটাই-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে কারখানার সামনে জড়ো হয়ে ছাঁটাইয়ের তালিকায় নাম দেখে কান্না ও ক্ষোভে ভেঙে পড়েন ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা।
ছাঁটাইয়ের মুখে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো হলো— কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন এবং কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।
কারখানা কর্তৃপক্ষের টাঙানো নোটিশে বলা হয়, তীব্র ব্যাংকিং জটিলতা ও বকেয়া গ্যাস বিল পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে গত ৬ জুন থেকে কারখানাগুলোতে লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কয়েক দফায় এই লে-অফের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
কারখানার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের যৌথ স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়, গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা, অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যাংকিং জটিলতা এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবলের কারণে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে বিভিন্ন সেকশন, বিভাগ ও ডিভিশনের নির্দিষ্ট কিছু পদ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২০ ধারা মোতাবেক মঙ্গলবার থেকে ৭৩৯ জন অতিরিক্ত শ্রমিক-কর্মচারীর ছাঁটাই কার্যকর করা হলো। নোটিশে আরও উল্লেখ করা হয়, ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের আইনি প্রাপ্য পাওনা বিধি মোতাবেক পরিশোধ করা হবে।
মঙ্গল সকালে ছাঁটাইয়ের নোটিশ দেখে ফটকের সামনে দীর্ঘ বছরের পুরোনো শ্রমিকদের মানবেতর দৃশ্য দেখা যায়। টানা ১৯ বছর ধরে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত আবেদা বেগম চোখের পানি মুছতে মুছতে আক্ষেপ করে বলেন, “জীবনের এতগুলো বছর এই কারখানায় কাটালাম। শেষ বয়সে হঠাৎ করে এসে শূন্য হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে, পরিবার নিয়ে এখন কই যাব?” অপর এক ভুক্তভোগী শ্রমিক জানান, ১৮ বছর ধরে কাজ করার পর হঠাৎ এভাবে চাকরি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তাঁরা।
এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুজ্জামান বলেন, “পাঁচবার লে-অফের নাটক সাজিয়ে অবশেষে কেয়া নিট কম্পোজিটের শত শত শ্রমিককে এক নোটিশে ছাঁটাই করা হলো। আমরা এই গণছাঁটাইয়ের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া বেতনসহ সব ধরনের ন্যায্য পাওনা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
কেয়া গ্রুপের মানবসম্পদ বিভাগের ব্যবস্থাপক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, “আইনবহির্ভূত কোনো কিছু করা হয়নি। ছাঁটাই হওয়া সব শ্রমিকের আইনি পাওনা শ্রম আইন অনুযায়ী দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়া হবে।” অন্যদিকে, কারখানা কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভবিষ্যতে কারখানায় নতুন জনবল প্রয়োজন হলে শ্রম আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
শিল্পাঞ্চলের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে গাজীপুর শিল্প পুলিশের এসপি মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, “কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে ৭৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের খবর পেয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং কারখানা এলাকায় শান্তি রক্ষা করতে অপ্রতুল স্থানে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।”
