নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : রাজধানীর খালের পাড়, ঝিল, ফুটপাত কিংবা নির্জন পরিত্যক্ত ভবনে একের পর এক অচিহ্নিত পচাগলে যাওয়া মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দাতব্য সংস্থা ‘আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম’-এর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি থেকে আগস্ট) কেবল ঢাকা শহরেই ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে। একের পর এক অজ্ঞাত লাশের বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি ডাটাবেজ না থাকায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
সর্বশেষ শ্যামপুরের জুরাইনে একটি পরিত্যক্ত টয়লেট থেকে ১৬ বছরের এক কিশোরের পচাগলা কঙ্কালসার মরদেহ উদ্ধারের পর শনাক্তকরণ প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ফের আলোচনায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) এবং ময়নাতদন্ত নীতিমালা অনুযায়ী যেকোনো অপমৃত্যু বা উদ্ধার হওয়া মরদেহের ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ডিএনএ প্রোফাইলিং এবং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা বাধ্যতামূলক। শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত পরিচয়হীন সব লাশ পুলিশের নির্দিষ্ট থানা নথিতে ‘অজ্ঞাত’ এবং সত্কারের পূর্বে ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে তালিকাভুক্তির আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) যৌথভাবে উদ্ধারকৃত মরদেহের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের সাথে সমন্বয় করে থাকে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই কেবল আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের নিকট সত্কারের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়।
ঘটনার বিশ্লেষণ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া ও গৃহহীনতার পাশাপাশি এসব মরদেহের পেছনে কোনো অপরাধ বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড লুকিয়ে আছে কি না, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা দরকার।”
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, রাজধানীর অজ্ঞাত মরদেহ বৃদ্ধি কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নির্দেশ করে না, বরং সামাজিক অবক্ষয় ও মানবিক নিরাপত্তাহীনতাকেও স্পষ্ট করে।
জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত জুরাইন ও রায়েরবাজার কবরস্থানে প্রতি মাসে গড়ে ৫০টি করে বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন করেছে সংস্থাটি।
পরিচয় না মেলায় এবং আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতিতে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রাজধানীজুড়ে নাগরিক অসন্তোষ তীব্রতর হচ্ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীলরা আশ্বাস দিয়েছেন যে, থানা পর্যায়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ ও জাতীয় পরিচয়পত্রের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দেখার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা হবে।
