নিজস্ব প্রতিবেদক, জয়পুরহাট : মেকআপ দিয়ে কৃত্রিম ক্ষত বানানো, ভায়োডিন মাখিয়ে নতুন ব্যান্ডেজ পেঁচানো, ডাক্তারের সিল-স্বাক্ষর জাল করা এবং এআই প্রযুক্তির অদ্ভুত ব্যবহার—এভাবেই জয়পুরহাটে তৈরি করা হয়েছে সারি সারি ভুয়া ‘জুলাইযোদ্ধা’। জুলাই অভ্যুত্থানে আহতদের সরকারি ভাতা পাইয়ে দেওয়ার নামে জয়পুরহাটে চলে আসা এই জঘন্য জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির মূল কারিগর খোদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলার তৎকালীন এক নম্বর সমন্বয়ক হাসিবুল হক সানজিদ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলা শহরের ‘কাজল ডিজিটাল স্টুডিও’কে জালিয়াতির কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। স্টুডিও মালিক তৌফিকুল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে স্পষ্ট জানান, পুরোনো শুকনো দাগ বা সাধারণ আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তিনি নতুন করে ব্যান্ডেজ ও মেকআপ পরিয়ে ক্যামেরা বন্দী করতেন এবং এআই দিয়ে ভুয়া ছবি বানাতেন। সেই ছবি আর জাল প্রেসক্রিপশন জমা দিয়েই সরকারি ভাতার তালিকায় নাম তুলতেন মাইশা আক্তার মাহিসহ অসংখ্য ভুয়া আবেদনকারী।
জালিয়াতির তালিকায় বাদ যাননি সমন্বয়ক সানজিদের নিজের পরিবারের সদস্যরাও। নিজ বড় ভাই আনিসুল রহমানকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ বানাতে জয়পুরহাট জেনারেল হাসপাতালের রোগীর ভুয়া সিরিয়াল ব্যবহার করা হয়। ৪ আগস্টের নথিতে হাসপাতালে ১০,৫৩৮ পর্যন্ত রোগীর সিরিয়াল থাকলেও আনিসুলের ভুয়া কাগজে দেখা যায় ১২ হাজারের ওপর। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সরদার রাশেদ মোবারক প্রথমে এগুলোকে ভুয়া বললেও, সানজিদের আরেক ভাই ওই হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার হওয়ার কারণে প্রশাসনিক চাপে পড়ে পরে নিজের বক্তব্য বদলে ফেলেন।
এমনকি সানজিদের বাড়ির গৃহকর্মীর মেয়ে রুকু আক্তারও ঠাঁই পেয়েছেন এই সরকারি ভাতার তালিকায়। রুকুর মা নিজেই সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন, “মেয়ের পা আগে থেকেই নষ্ট ছিল, সে কোনো আন্দোলনে যায়নি। রাস্তায় সাধারণ পড়ে ব্যথা পাওয়ার ঘটনাকে সুযোগ বানিয়ে সানজিদ ওকে জুলাইযোদ্ধার তালিকায় তুলে দিয়েছে।”
প্রকৃত আন্দোলনকারী ও আহতদের বাদ দিয়ে এই লুটপাটের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দ্বিতীয় শীর্ষ সমন্বয়ক আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রধান সমন্বয়ক সানজিদের শরীর পরীক্ষা করে তিনি নিজে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাননি; অর্থাৎ স্বজনদের পাশাপাশি সানজিদ নিজেও একজন ‘ভুয়া আহত জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন।
চরম এই জালিয়াতির স্বপক্ষে অদ্ভুত যুক্তি দিয়ে সানজিদ বলেন, “কেউ জুলাইয়ের বিপক্ষে না থাকলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা দোষের কিছু নয়।”
বিষয়টি নিয়ে জয়পুরহাটের সিভিল সার্জন ডা. মো. আল মামুন জানান, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও তথ্য হাতে পেলে জালিয়াতি করে তালিকায় ওঠা ব্যক্তিদের নাম অবিলম্বে বাতিল করা হবে। বর্তমানে জেলায় ৮৬ জন তালিকাভুক্ত ভাতাভোগী রয়েছেন এবং আরও ২৪ জনের নাম চূড়ান্ত পর্যালোচনায় রয়েছে।
