নিজস্ব প্রতিবেদন : যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিজের জীবন বাজি রেখে জলন্ত ঘর থেকে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে অক্ষত উদ্ধার করার পর, গুরুতর দগ্ধ বাংলাদেশি প্রবাসী রফিকুল ইসলাম সোহাগ (৪৭) অবশেষে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। দীর্ঘ ২১ দিন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আজ শনিবার জোহরের নামাজ শেষে ব্রুকলিনের বাইতুল মামুন মসজিদে সোহাগের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পরে নিউ জার্সির একটি মুসলিম কবরস্থানে তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হবে। নিহত রফিকুল ইসলাম সোহাগের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী এলাকায়।
পারিবারিক ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জুন ভোর সোয়া চারটার দিকে নিউইয়র্ক শহরের জ্যামাইকার ১৭২-১২ ৯১ অ্যাভিনিউতে অবস্থিত একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন দুই তলা আবাসিক ভবনের বেজমেন্টে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতের মামাতো ভাই মোহাম্মদ ফয়েজ দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সোহাগ ভাই জ্যামাইকায় একটি বেজমেন্টে সপরিবারে ভাড়া থাকতেন। দুর্ভাগ্যবশত পুরো বেজমেন্ট থেকে বের হওয়ার পথ ছিল মাত্র একটি। সেখানে কোনো ফায়ার অ্যালার্ম বা ধোঁয়া শনাক্তকারী যন্ত্রও ছিল না। ফায়ার অ্যালার্মটা যদি সচল থাকত, তবে আমার ভাই ও তাঁর পরিবার আগেই সতর্ক হতে পারত এবং আজকে এই মর্মান্তিক পরিণতি হতো না।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফয়েজ ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরও জানান, ভোররাতে আগুন লাগার পর সোহাগ প্রথমে নিজে জ্বলন্ত আগুন মাড়িয়ে একমাত্র প্রধান দরজা দিয়ে কোনো রকমে বাইরে বের হতে সক্ষম হন। কিন্তু ভেতরে তাঁর পরিবার আটকে আছে দেখে তিনি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করেন। বাইরে থেকে আগুনের লেলিহান শিখা উপেক্ষা করে একমাত্র জানালাটি টেনে ভেঙে ফেলেন তিনি। এরপর সেই ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে আটকে থাকা তাঁর স্ত্রী ঝরনা আক্তার এবং দুই শিশুসন্তান জিহাদ ও জুবায়েরকে একে একে টেনে বাইরে বের করে আনেন। পরিবারকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করতে পারলেও ততক্ষণে সোহাগের শরীরের সিংহভাগ অংশ আগুনে মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়ে যায়।
সোহাগের পারিবারিক বন্ধু জাহাঙ্গীর আলম জানান, মাত্র সাত–আট মাস আগে সোহাগ তাঁর এই পরিবারটিকে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় নিয়ে এসেছিলেন। সোহাগ পেশায় একজন সাইকেল ডেলিভারিম্যান ছিলেন। প্রতিদিনের মতো তিনি সাধারণত তাঁর বৈদ্যুতিক সাইকেলের বড় লিথিয়াম ব্যাটারিটি ঘরের ভেতরে চার্জে দিয়ে ঘুমাতে যেতেন। সবার প্রাথমিক ধারণা, ওই ব্যাটারি অতিরিক্ত চার্জ হয়ে বিস্ফোরণ ঘটার কারণেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।
নিউইয়র্ক সিটি ফায়ার ডিপার্টমেন্ট (FDNY) গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, ২৬ জুন ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে সরকারি জরুরি নম্বর ৯১১-এর মাধ্যমে জ্যামাইকার ওই ভবনের বেজমেন্টে আগুন লাগার খবর আসে। খবর পেয়ে ১৭২ ও ১৭৩ নম্বর স্ট্রিটের মধ্যবর্তী ওই ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের মোট ২১টি ইউনিট দ্রুত ছুটে যায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উদ্ধারকাজে মোট ৭৯ জন ফায়ার ফাইটার ও জরুরি চিকিৎসাসেবা (ইএমএস) কর্মী অংশ নেন। ঘটনাস্থল থেকে দগ্ধ চারজনকে উদ্ধার করে দ্রুত নাসাউ কাউন্টি মেডিক্যাল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিস নিশ্চিত করেছে, ঘরের ভেতর থেকে একটি পোড়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি পাওয়া গেছে। প্রায় আধা ঘণ্টার চেষ্টায় ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এলেও, শেষ রক্ষা হলো না বীর পিতা সোহাগের।
